মৌর্য শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো | Mauryan Empire


মৌর্য শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো 

ভূমিকা:

মৌর্য শাসনব্যবস্থায় রাজাই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা এবং সকল ক্ষমতার ও উৎস। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান শাসক, আইনপ্রণেতা, বিচারক ও সেনাপতি। একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রাজা কিন্তু কখনই স্বৈরাচারী ছিলেন না বা মৌর্য রাজতন্ত্র কখনই ‘বল্গাহীন স্বৈরতন্ত্র’ ছিল না। তাঁরা ছিলেন ‘প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী'। তাঁরা সর্বদাই পুরনো রীতিনীতি মেনে শাসন পরিচালনা করতেন এবং ধর্মশাস্ত্র অনুসারে প্রজাকল্যাণে নিয়োজিত থাকতেন। মৌর্য সম্রাটরা কখনই দৈবস্বত্ব দাবি করে নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা বরপুত্র বলে দাবি করেন নি। তাঁরা নিজেদের ‘দেবানাম্ পিয়’ বা দেবতাদের প্রিয় বলে অভিহিত করতেন এবং বংশানুক্রমিকভাবে সিংহাসনে বসতেন।


১. মন্ত্রী পরিষদ:

রাজাকে শাসনকার্যে যাঁরা সাহায্য করতেন তাঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ‘সচিব’ নামে কর্মচারীরা। সচিবদের মধ্যে থেকে দক্ষ ও অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন ব্যক্তিদের মন্ত্রী বা ‘মন্ত্রীণ’ পদে নিযুক্ত করা হতো। অর্থ ও চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই মন্ত্রী নিযুক্ত হতেন। তাঁদের বেতন ছিল বছরে ৪৮ হাজার পান। তাঁরা শাসননীতি ও পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে রাজাকে পরামর্শ দিতেন। এছাড়াও ‘মন্ত্রী পরিষদ' বলে একটি সভা ছিল। কেবলমাত্র জরুরী অবস্থাতেই এই সভা রাজাকে পরামর্শ দিত। মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের বেতন ছিল বছরে ১২ হাজার পান। ‘অমাত্য’ নামে কর্মচারীদের ওপর রাজস্ব, অর্থ, বিচার ও প্রশাসন প্রভৃতি বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হোত। বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁরা ঐ পদ পেতেন। খনি, গোশালা, অশ্বশালা প্রভৃতি তদারকির দায়িত্ব ছিল ‘অধ্যক্ষ’-দের ওপর। অর্থশাস্ত্রে বত্রিশ জন ‘অধ্যক্ষের’ উল্লেখ আছে। এছাড়া, করণিক, পুরোহিত, দৌবারিক, প্রতিবেদক, দুর্গপাল, গুপ্তচর প্রভৃতি নানা ধরনের কর্মচারী ছিল। এই যুগে কর্মচারীদের নগদ বেতন দেওয়া হত এবং কোনভাবেই বংশানুক্রমিকভাবে কাউকে কোন পদে নিয়োগ করা হত না।


২. প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা:

চন্দ্রগুপ্তের আমলে বিশাল মৌর্য সম্রাজ্য চারটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল—প্রাচ্য, উত্তরাপথ অবন্তী ও দক্ষিণাপথ। প্রদেশগুলিকে ‘দেশ’ বলা হত। শাসনকার্যের সুবিধার জন_ প্রদেশগুলিকে বিষয় বা আহরে (জেলা) বিভক্ত করা হয়। গ্রাম ছিল মৌর্য শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর। গ্রামের প্রধানকে বলা হত ‘গ্রামিক’ গ্রামিকের ওপরে ছিলেন ‘গোপ’ এবং তিনি পাঁচ-দশটি গ্রামের প্রধান ছিলেন। ‘সমাহর্তা’ ছিলেন জেলার প্রধান শাসনকর্তা। প্রদেশের শাসনকর্তাকে বলা হত ‘প্রাদেশিক’। সাধারণত রাজপরিবারের লোকদের ওপরেই প্রদেশের শাসনভার ন্যস্ত হত তাঁদের বলা হত ‘আর্যপুত্র'।


৩. বিচার ব্যবস্থা:

বিচার বিভাগে রাজা ছিলেন সর্বেসর্বা। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের সাহায্যে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি নিজেই অনেক সময় বিচার করতেন। অর্থশাস্ত্রে দুই ধরনের বিচারালয়ের উল্লেখ আছে—‘ধর্মান্তীয় ও ‘কন্টকশোধন'। দেশের অন্যান্য অংশে নানা ধরনের বিচারালয় ছিল। গ্রামে ‘গ্রামিক' এবং নগয়ে ‘নগর-ব্যবহারিক’ বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। কৌটিল্য ও মেগাস্থিনিস—দু’জনেই কঠোর দণ্ডবিধির কথা উল্লেখ করেছেন। কঠোর জরিমানা, অঙ্গচ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড, শুলে চড়ানো প্রভৃতি শাস্তির ব্যবস্থা এই যুগে প্রচলিত ছিল।


৪. রাজস্ব:

ভূমিরাজস্ব ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস এবং তার হার ছিল উৎপন্ন শস্যের -ষষ্ঠাংশ বা এক-চতুর্থাংশ। এছাড়া, শুল্ক, আমদানি-রপ্তানি, বিক্রয় কর, জলকর, পথকর, খনিকর এবং বিভিন্ন বৃত্তি, পানশালা প্রভৃতি থেকে সরকারের অর্থাগম হত। কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর বেতন, সেচ, জনহিতৈষণামূলক কর্ম প্রভৃতি খাতে সরকারের অর্থ ব্যয় হত। ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা বলেন , এইভাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং তাকে একটি সুদৃঢ় অর্থনীতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close