আকবরের ধর্মনীতি আলোচনা করো | Discussion of Akbar's religious policy


মোগল সম্রাট আকবরের ধর্মনীতি | দীন-ই- ইলাহি | Discussion of Akbar's religious policy


ভূমিকা: ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকবর্গের মধ্যে আকবরই ছিলেন সর্বাপেক্ষা উদার ও পরধর্মমত-সহিষ্ণুতার প্রবর্তক। ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম মুসলিম শাসক যিনি রাজনীতি থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করেন এবং রাষ্ট্রকে উলেমাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করে ভারতে একটি জাতীয় রাষ্ট্র গঠনে সচেষ্ট হন। 


বিভিন্ন প্রভাব: রাষ্ট্র গঠনে আকবরের উদার ধর্মনীতির মূলে বিভিন্ন প্রভাব কার্যকর ছিল। 

প্রথমত—নিজ বংশধারা ও মাতা হামিদা বানু বেগম এবং কাবুলে অবস্থানকালে সুফী পণ্ডিতদের সংস্পর্শ ও গৃহশিক্ষক আব্দুল লতিফ-এর প্রভাব তাঁর মনে উদারতার বীজ বপন করে। 

দ্বিতীয়ত—রাজপুত মহিষীদের প্রভাব এবং শেখ মুবারক ও তাঁর দুই পুত্র ফৈজী ও আবুল ফজল-এর সংগে নিবিড় বন্ধুত্ব তাঁকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। 

তৃতীয়ত—বিভিন্ন ধর্মমতের প্রচারকদের নিবিড় সাহচর্যে তাঁর চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া, বলা যায় যে, ষোড়শ শতক হল ধর্মসংস্কার আন্দোলনের যুগ। ভক্তি আন্দোলন ও সুফী মতবাদ এই যুগে এক নতুন আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। তাই বলা যায় যে, আকবর কেবলমাত্র এই শতাব্দীর সন্তান ছিলেন না—তিনি ছিলেন এই যুগের সর্বোত্তম প্রতিনিধি।


ধর্মচিন্তার বিবর্তন- ইবাদতখানা: প্রথম জীবনে তিনি নিষ্ঠাবান সুন্নী মুসলমান ছিলেন। শেখ মুবারক ও তাঁর দুই পুত্রের সংস্পর্শে এসে তিনি যুক্তিবাদী মুসলিমে পরিণত হন এবং ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রীতে তিনি ‘ইবাদখানা’ নির্মাণ করে ধর্ম ও দর্শনের মূল বিষয়গুলি সম্পর্কে আলোচনার জন্য সবরকম ব্যবস্থা করেন। প্রথমদিকে সেখানে কেবলমাত্র ইসলাম ধর্ম নিয়েই আলোচনা হত কিন্তু সম্রাট এতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে সেখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন, পার্শী প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মজ্ঞানীদের আহ্বান জানান। এই সব ধর্মজ্ঞানীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হিন্দু পণ্ডিত পুরুষোত্তম ও দেবী, জৈন প্রচারক হরিবিজয় সুরী ও বিজয়সেন সুৱী এবং জেসুইট ধর্মযাজক ফাদার একোয়াভাইভা ও মনসেরেট। এই সব ধর্মজ্ঞানীদের সংগে আলোচনার মাধ্যমে গোঁড়া ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর আনুগত্য শিথিল হয়ে পড়ে এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে, ঈশ্বর এক এবং সকল ধর্মের মূলকথা এক ও অভিন্ন।


আকবরের উপলব্ধির কারণ: ঐতিহাসিক ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরী আকবরের এই নতুন উপলব্ধির পশ্চাতে দু'টি কারণ দেখেছেন। প্রথমত—তিনি উপলব্ধি করেন যে, হিন্দু-প্রধান ভারতে সুদৃঢ় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দূরে সরিয়ে রাখলে চলবে না। দ্বিতীয়ত—সম্ভবত তাঁর ধারণা হয়েছিল যে, গোঁড়া মুসলিমদের হাতে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। হয়তো এই কারণে গোঁড়া উলেমাদের কাছ থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরে সরিয়ে রাখা ও উদার মতাবলম্বী পার্শ্বচর দ্বারা পরিবৃত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।


তথাকিত অভ্রান্ত নির্দেশনামা: এর ফলে ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফতেপুর সিক্রীর মসজিদের ইমামকে সরিয়ে দিয়ে নিজে উপাসনা পরিচালনা করতে শুরু করেন এবং এক ‘মাজাহার’ বা নিদর্শনামা জারী করে বলেন যে, তিনিই হলেন ‘ইমাম-ই-আদিল’ অর্থাৎ ঐস্লামিক আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকার এবং সাম্রাজ্যের সর্বপ্রকার জাগতিক ও ধর্মীয় বিষয়ের প্রধান। তিনি জানান যে, ইসলাম ধর্ম ও কোরানের কোন ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সম্রাটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। ঐতিহাসিক স্মিথ এই ঘোষণাপত্রটিকে ‘অভ্রান্ত নির্দেশনামা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন যে, এই ঘোষণাপত্র জারীর দু-এক বছরের মধ্যে আকবর ইসলাম-বিরোধী হয়ে ওঠেন। বলা বাহুল্য, স্মিথের এই বক্তব্যের সমর্থনে কোন তথ্য পাওয়া যায় না বরং বলা যায় যে, উলেমাদের প্রভাব খর্ব করে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই ছিল আকবরের উদ্দেশ্য।


দীন-ই-ইলাহী: ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ধর্মচিন্তার বিবর্তনে তিনি শেষ স্তরে উপনীত হয়ে ‘দীন-ই-ইলাহী নামে এক নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মমতের প্রবর্তন করলেন। সকল ধর্মের সারবস্তু নিয়ে এই ধর্মমত গঠিত এবং এই ধর্মমতে কোন সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধ বিশ্বাস, দেবতা, দেব-মন্দির, পুরোহিত বা ধর্মগ্রন্থের স্থান ছিল না— স্বয়ং সম্রাটই ছিলেন এর প্রবক্তা এবং যে-কোন মানুষ এই ধর্মমত গ্রহণ করতে পারত। নবপ্রচারিত এই ধর্মমত এত বেশী তাত্ত্বিক ছিল যে, কেবলমাত্র আঠারো জন বিশিষ্ট মুসলিম ও একজন বিশিষ্ট হিন্দু বীরবল এই ধর্মমত গ্রহণ করেন এবং আকবরের মৃত্যুর সংগেই এই ধর্মমতেরও সমাধি রচিত হয়।


মূল্যায়ন:

ঐতিহাসিক স্মিথ-এর মতে, এই নবধর্মমত আকবরের বুদ্ধিহীনতার স্মৃতিস্তম্ভ ছিল।* বলা বাহুল্য, স্মিথের এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধর্মমত ছিল এক ধরনের ভারতীয় ধর্ম এবং আকবর ছিলেন ভারতবর্ষের জাতীয় নেতা। তাঁর আদর্শ ছিল ‘সুলএ-কুল’ বা সকল ধর্মের সারসমন্বয় করে একটি জাতীয় ধর্ম গড়ে তোলা।' ডঃ ত্রিপাঠী-র মতে দীন-ই-ইলাহী এমন এক আদর্শ স্থাপন করে যাতে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পার্থক্য সত্ত্বেও জনগণ একটি সাধারণ বেদীতে মিলতে পারে। এটি সম্রাটের সিংহাসনে একটি আধ্যাত্মিক জ্যোতির্বলয় রচনা করে নিঃসন্দেহে আকবরের হাতকে শক্তিশালী করে। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিবাদ যথেষ্ট পরিমাণে স্তিমিত হয়, রাষ্ট্রকার্যে উলেমা ও মোল্লাদের প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে খর্ব হয় এবং ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সম্রাটের সর্বময় কর্তৃত্ব স্বীকৃতি লাভ করে।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close