ইলতুৎমিসের কৃতিত্ব আলোচনা করো | Short Notes on Iltutmish


ইলতুৎমিসের কৃতিত্ব | ইলতুৎমিসের অবদান | দিল্লি সুলতানী সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা


ভূমিকা:

কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর দত্তকপুত্র আরাম শাহ্ দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। তিনি খুবই অকর্মণ্য ছিলেন। ফলে দিল্লীর আমীর ওমরাহদের আমন্ত্রণে কুতুবউদ্দিনের জামাতা ইলতুৎমিস ১২১১ খ্রিস্টাব্দে আরাম সিংহাসন আরোহণ শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন। প্রথম জীবনে ইলতুৎমিস কুতুবউদ্দিনের ক্রীতদাস ছিলেন। পরে নিজ কর্মদক্ষতা ও বিচক্ষণতার গুণে দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেন এবং কুতুবউদ্দিন নিজ কন্যার সঙ্গে তাঁর বিবাহ দিয়ে তাঁকে বদাউন প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।


সমস্যা ও বিদ্রোহ:

সিংহাসনে আরোহণ করে ইলতুৎমিসকে নানা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কুতুবউদ্দিনের সহকর্মী ও সিন্ধুদেশের শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবাচা নিজেকে স্বাধীন নরপতি রূপে ঘোষণা করে লাহোর জয় করেন ও পাঞ্জাব দখলের পরিকল্পনা করেন। কুতুবউদ্দিনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী তাজউদ্দিন ইলদীজ গজনীর শাসক হিসেবে ভারতের ওপর নিজ সার্বভৌমত্ব দাবি করেন ও ইলতুৎমিসকে নিজ প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করতে চান। বাংলার তৎকালীন শাসনকর্তা খলজী আলি মর্দান দিল্লীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই সব বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে জালোর, রণথম্বোর, আজমীর, গোয়ালিয়র প্রভৃতি স্থানের রাজপুতগণ ক্ষমতা পুনর্দখল করেন। এছাড়া, দিল্লী সুলতানীর কিছু আমীর ইলতুৎমিসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর ফলে নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতানী শাসন ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। 


বিদ্রোহ দমন:

সংকটময় পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে তিনি কঠোর হস্তে শত্রুদমনে অগ্রসর হন। তিনি প্রথমেই দিল্লী, বদাউন, অযোধ্যা, বারাণসী, শিবালিক প্রভৃতি অঞ্চলের বিদ্রোহী আমীর ওমরাহদের দমন করে নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন। তাজউদ্দিন ইলদীজ (১২১৬ খ্রিঃ) ও নাসিরউদ্দিন কুবাচা (১২২৬ খ্রিঃ)-কে পরাজিত করে তিনি পাঞ্জাব ও সিন্ধুর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেন। বাংলার বিদ্রোহী নবাবকে পরাজিত করে (১২২৬ খ্রিঃ) বাংলার ওপর দিল্লী সুলতানীর ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। রণথম্বোর (১২৩২ খ্রিঃ), জালোর (১২২৮ খ্রিঃ), আজমীর, গোয়ালিয়র (১২৩২ খ্রিঃ) প্রভৃতি স্থানও তিনি পুনরুদ্ধার করেন।


নতুন রাজ্যজয়:

কেবলমাত্র পুনরুদ্ধারের কাজই নয়—নতুন কিছু অঞ্চলেও তিনি দিল্লী সুলতানীর আধিপত্য সম্প্রসারিত করেন। তিনি শিবালিক পর্বতের অন্তর্ভুক্ত মান্দোর জয় করেন এবং মালব রাজ্য আক্রমণ করে ভিলসা ও উজ্জয়িনী দখল করেন (১২৩৪ খ্রিঃ)। উজ্জয়িনী জয়ের পর তিনি সেখান থেকে সম্রাট বিক্রমাদিত্যের একটি মূর্তি দিল্লী নিয়ে যান।


মোঙ্গল আক্রমণ:

ইলতুৎমিসের রাজত্বকালে (১২২১ খ্রিস্টাব্দে) দুর্ধর্ষ মোঙ্গল-নায়ক চিঙ্গিজ খাঁ মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার নানা রাজ্য জয় করে খিবা বা খোয়ারিজম রাজ্য আক্রমণ করেন। খিবা-র অধিপতি জালালউদ্দিন মঙ্গবরণী প্রাণভয়ে পাঞ্জাবে উপস্থিত হয়ে ইলতুৎমিসের আশ্রয় প্রার্থনা করেন। চিঙ্গিজ খাঁ-ও তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করে সিন্ধুনদের তীরে উপনীত হন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ইলতুৎমিস উপলব্ধি করেন যে, জালালউদ্দিনকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থই হল চিঙ্গিজ খাঁর আক্রমণের সম্মুখীন হওয়া এবং তা নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতানী শাসনের অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক । প্রত্যাখ্যাত জালালউদ্দিন ভারত ত্যাগ করলে চিঙ্গিজ খাঁ-ও সিন্ধু ও পশ্চিম পাঞ্জাব লুন্ঠন করে ভারত ত্যাগ করেন এবং এইভাবে নবপ্রতিষ্ঠিত সুলতানশাহী আশু ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। বলা বাহুল্য, ওই ঘটনা ইলতুৎমিসের প্রখর রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচায়ক।


খলিফার অনুমোদন:

১২২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুসলমান জগতের ধর্মগুরু বাগদাদের ‘খলিফা’র কাছ থেকে ‘সুলতান-ই-আজম্’ (মহান সুলতান) উপাধি পান। এর ফলে দিল্লী সুলতানীর গৌরব বৃদ্ধি পায় এবং দিল্লী সুলতানীর স্বাধীন ও পৃথক অস্তিত্ব মুসলিম জগতে স্বীকৃতি লাভ করে। খলিফার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত ইলতুৎমিস তাঁর মুদ্রায় নিজেকে ‘খলিফার সেনাপতি’ বলে অভিহিত করেন।


কৃতিত্ব: 

ইলতুৎমিসকে দিল্লীর তুর্কী সুলতান বা ‘দাস’ বংশীয় সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান বলা হয়। অনেকের মতে, তিনি হলেন দিল্লী সুলতানীর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। কুতুবউদ্দীন রাজ্য জয় করেছিলেন, কিন্তু সুসংহত করতে পারেন নি। আরাম শাহের রাজত্বকালে রাজ্যের বহু অংশ দিল্লীর হস্তচ্যুত হয়ে যায়। ইলতুৎমিস সেই অংশগুলি পুনরুদ্ধার করে সুলতানী শাসনকে সুসংহত ও দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। ঐতিহাসিক ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী বলেন যে, তাঁর আমল থেকেই ভারতে সার্বভৌম মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। তিনি দেশকে দিয়েছিলেন (১) একটি রাজধানী, (২) গজনী ও ঘুরের অধীনতা থেকে মুক্ত এবং খলিফা কর্তৃক স্বীকৃত একটি স্বাধীন রাজ্য, (৩) একটি রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং (৪) তুর্কী আমীরদের দ্বারা গঠিত একটি শাসকশ্রেণী। কুতুবউদ্দিনের আমলে সাময়িকভাবে দিল্লী রাজধানীর মর্যাদা পেলেও, ইলতুৎমিসের আমল থেকেই তা প্রকৃতপক্ষে ভারতের তুর্কী রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং তিনি দিল্লী নগরীকে মসজিদ, মিনার ও অট্টালিকায় সুসজ্জিত করে এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি বৃদ্ধি করেন। 


কুতুবউদ্দিনের সময়ে নবপ্রতিষ্ঠিত তুর্কী রাজ্যের ওপর মধ্য এশিয়ার প্রভাব নানাভাবে কাজ করছিল, কিন্তু ইলতুৎমিস মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন এক স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তুর্কী সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম ‘ইক্‌তা’ ব্যবস্থা, সামরিক সংগঠন, মুদ্রার প্রবর্তন ও দরবারে নানা আদব-কায়দার প্রবর্তন করে ভারতে অসামরিক তুর্কী শাসনের সূচনা করেন। মুদ্রা-বিশেষজ্ঞ নেলসন রাইট-এর মতে, দিল্লীর মুদ্রা ব্যবস্থার ইতিহাসে ইলতুৎমিসের রাজত্বকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৎ, ধার্মিক, বিদ্যোৎসাহী ও শিল্পানুরাগী ছিলেন। বহু জ্ঞানী-গুণী তাঁর রাজসভা অলংকৃত করতেন। বিখ্যাত কুতুব মিনারের নির্মাণকার্য তিনি সমাপ্ত করেন।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায় 




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close