সুফিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা করো | Short Note On Sufi Movement


সুফিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ | সুফিবাদের মূল উৎস | সুফিবাদের মূল আদর্শ


ভক্তিবাদের মাধ্যমে যখন হিন্দুধর্মে উদারনৈতিক সংস্কার চলছিল, ঠিক সেই সময় মুসলিম ধর্মেও এক উদারনৈতিক সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। এই মতবাদ সুফীবাদ নামে পরিচিত। সুলতানী যুগে উত্তর ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম I এই মতবাদের উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মতামত আছে। অনেকের মতে, এই মতবাদের ওপর বৌদ্ধ প্রভাব বিদ্যমান। মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধধর্ম বিস্তৃত হয়েছিল এবং এই স্থানের বৌদ্ধ অধিবাসীরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলে এই ধর্মে বৌদ্ধ প্রভাব পড়ে। তা ছাড়া, বৌদ্ধ ও হিন্দু সাধকরা পশ্চিম এশিয়ায় ভ্রমণ করতেন। ‘অমৃত-কুণ্ড’ নামে হিন্দু যোগ সাধনার একটি গ্রন্থ ফার্সীতে অনূদিত হয়ে খুবই প্রচারিত হয়। এইসব নানা যোগাযোগের ফলে হিন্দু ও বৌদ্ধদের অহিংসা, ত্যাগ, বৈরাগ্য, ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ, উপবাস, যোগসাধনা প্রভৃতি আদর্শের প্রভাব সুফীবাদের ওপর পড়ে। তাই বলা যায় যে, বৌদ্ধধর্ম, হিন্দু বেদান্ত দর্শন ও অন্যান্য নানা ধর্মীয় আদর্শের সমন্বয়ে সুফীবাদের উৎপত্তি।


ইউসুফ হোসেন-এর মতে, সুফীবাদ হল ইসলামের রূপান্তর। ইসলাম ধর্মের সূচনাপর্বেই সুফীবাদের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। তাঁর মতে “ইসলামের বক্ষদেশ থেকেই সুফীবাদের জন্ম।” হজরত মহম্মদের ইসলাম ধর্ম প্রচারকালে একদল জ্ঞানী ও ভাববাদী মানুষ এই ধর্মমত গ্রহণ করেন। তাঁদের কাছে হজরত মহম্মদ ছিলেন পয়গম্বর এবং কোরানই ছিল তাঁদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। কোরানের শিক্ষা ও মহম্মদের জীবন তাঁদের মূল আদর্শ হলেও, তাঁরা ইসলামনির্দিষ্ট ধর্মপালন পদ্ধতি ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধী ছিলেন। বাহ্যিক অনুষ্ঠানের পরিবর্তে তাঁরা ঈশ্বরের করুণা লাভের জন্য অন্তরের পবিত্রতার ওপর জোর দিতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, “পবিত্র অন্তরের মধ্যেই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান সম্ভব”, প্রেম ও ভক্তিই ঈশ্বর লাভের প্রধানতম উপায় এবং সর্বভূতে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন সম্ভব। 


সুফী সাধকেরা গভীর ধর্মভাবে উদ্বুদ্ধ জীবনযাপন করতেন এবং অতীন্দ্রিয়বাদ ও কোরানের ভাবগত ব্যাখ্যার ওপর জোর দিতেন। তাঁরা ত্যাগ, বৈরাগ্য, সন্ন্যাস, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, পবিত্রতা, দারিদ্র, কৃচ্ছসাধনা, উপবাস, প্রণায়াম প্রভৃতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই ধর্মমতে সর্বধর্মসমন্বয়, সর্বজীবে প্রেম, ঈশ্বরের প্রতি আত্মসর্পণ, একেশ্বরবাদ, সব কিছুই ঈশ্বরের অঙ্গ—প্রভৃতি আদর্শ উচ্চারিত হয়েছে। গভীর ধর্মভাবে উদ্বুদ্ধ সুফীরা ঈশ্বরচিন্তা ভিন্ন অপর কোন চিন্তার প্রশ্রয় দিতেন না এবং হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে প্রেমধর্ম প্রচার করতেন। হিন্দুধর্মের মত সুফীবাদেও গুরু-শিষ্য সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। গুরুকে কেন্দ্র করেই সুফী সন্ন্যাস জীবন আবর্তিত হয়। গুরুকে বলা হয় ‘পীর’ বা ‘খাজা’। পীরের কর্মকেন্দ্রকে বলা হয় ‘দরগা’ বা ‘খান্‌ন্কা’। সুফী ধর্মের অনুগামীদের বলা হয় ‘ফকির’ বা ‘দরবেশ'।


আরবদের সিন্ধু জয়ের পূর্বেই পাঞ্জাবে সুফীবাদ প্রচারিত হতে থাকে। দ্বাদশ শতকের মধ্যেই এদেশে সুফীরা বেশ কয়েকটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে খাজা মইনুদ্দিন চিস্তি আজমীরে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে চিস্তি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি নিম্নবর্গের নির্যাতিত হিন্দুদের মধ্যে ধর্মপ্রচার করতেন। তাঁর অন্যতম শিষ্য শেখ কুতুবউদ্দিন বক্তিয়ার কাকী ইলতুৎমিসের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন। এই সম্প্রদায়ের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সন্ত ছিলেন নিজামউদ্দিন আউলিয়া। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও ধর্মভাবে আকৃষ্ট হয়ে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত কবি আমীর খসরু এবং ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরণী। স্বয়ং সুলতান আলাউদ্দিন খলজীও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ভারতে ধর্ম-সমন্বয়ের ইতিহাসে তাঁর অবদান অতি উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘চিরাগ-দিল্লী’ বা ‘দিল্লীর আলো’ বলে পরিচিত ছিলেন।


মূলত পাঞ্জাব, মুলতান ও বাংলায় ‘সুহরাবর্দি’ সম্প্রদায়ের কার্যকলাপ সীমাবদ্ধ ছিল। শেখ শিহাবউদ্দিন সুহরাবর্দি ও হামিদউদ্দিন নাগোরী ছিলেন এই সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট সন্ত। চিস্তি সম্প্রদায় মনে করত যে, অর্থসম্পদ ধর্মজীবনে উন্নতির বিঘ্নস্বরূপ, কিন্তু সুরাবর্দি সম্প্রদায়ের ধারণা ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। চিক্তি সম্প্রদায় রাজনীতি থেকে দূরে থাকত কিন্তু সুহরাবর্দিরা প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদানের পক্ষপাতী ছিল। পঞ্চদশ শতকে ভারতে তিনটি নতুন সুফী সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়—কাদিরী, শাত্তারি ও নক্শবন্দী সম্প্রদায়। সব সম্প্রদায়ই সাধারণভাবে শরিয়ৎ-বিধিকে মান্য করত, তবে কালন্দর প্রভৃতি কয়েকটি সম্প্রদায় সাধারণভাবে শরিয়ৎ-কে অগ্রাহ্য করত।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।



 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close