গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজতান্ত্রিক আদর্শ | Short Note On Ghiyasuddin Balban


গিয়াসউদ্দিন বলবনের কৃতিত্ব | গিয়াসউদ্দিন বলবনের রাজকীয় আদর্শ | গিয়াসউদ্দিন বলবন কিভাবে দিল্লি সুলতানিকে সুদৃঢ় করেন


ভূমিকা:

নাসিরউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুর ও প্রধানমন্ত্রী উলুঘ খাঁ ‘গিয়াসউদ্দিন বলবন’ নাম ধারণ করে সিংহাসনে বসেন। ইলতুৎমিস প্রতিষ্ঠিত ‘চল্লিশ চক্র’ নামক শক্তিশালী ক্রীতদাস সংগঠনের অন্যতম প্রধান নায়ক এবং নাসিরউদ্দিন মামুদের প্রধান মন্ত্রী হিসেবে গিয়াসউদ্দিন বলবন প্রভূত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই তাঁকে তথাকথিত দাসবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতানে পরিণত করে। তাঁর রাজত্বকাল দিল্লী-সুলতানীর ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


সমস্যা:

ইলতুৎমিসের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের আমলে শাসনকার্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে এবং দিল্লীর নিকটবর্তী স্থানে মেওয়াটি দস্যুদের উপদ্রবে জনজীবনে নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। আমীরওমরাহরা ক্ষমতালিপ্সু, উদ্ধত ও ষড়যন্ত্রপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজকীয় মর্যাদা শোচনীয়ভাবে খর্ব হয়। বহিরাগত মোঙ্গলদের ধারাবাহিক আক্রমণ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করে। এই অবস্থায় সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে সাম্রাজ্যকে তিনি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন।


অরাজকতা ও বিদ্রোহ দমন:

দস্যুদল ও বিদ্রোহীদের আক্রমণে দিল্লী ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল, দোয়াব অঞ্চল, কাম্পিল, পাতিয়ালি ও রোহিলখণ্ড প্রভৃতি স্থানের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছিল। নৃশংস অত্যাচার ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বলবন এই সব অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করেন। এছাড়া, উপদ্রুত অঞ্চলগুলিতে সেনানিবাস স্থাপন করে তিনি এই সব অঞ্চলে ভবিষ্যৎ শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করেন। এ সময় বাংলার শাসনকর্তা তুমিল খান বাংলায় স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বলবন তাঁকে পরাজিত ও নিহত করেন এবং তাঁর অনুচরদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।


রাজকীয় আদর্শ:

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তিনি উপলব্ধি করেন যে, ক্ষমতালিপ্স ও উর্দ্ধত ওমরাহদের চক্রান্তই কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার প্রধান কারণ। স্বৈরতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী বলবন মনে করতেন যে, কেবলমাত্র চরম স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমেই প্রজাদের আনুগত্য আদায় ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব। ওমরাহদের শক্তি খর্ব করে রাজশক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি দু'টি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন—(১) নতুন রাজকীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও (২) ‘চল্লিশ চক্র’-এর উচ্ছেদ সাধন। রাজপদকে মহিমান্বিত করে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন যে, সুলতান ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তিনি জনসাধারণ বা ওমরাহদের ইচ্ছায় সিংহাসনে বসেন নি। ঈশ্বর-আদিষ্ট পুরুষ হিসেবে তাঁর কাজকর্মের সমালোচনা করার অধিকার মর্ত্যলোকে কারোর নেই। তিনি কোনো উচ্চ সরকারী পদে নিয়োগ করতেন না। নিজেকে তিনি পৌরাণিক তুর্কী বীর আফ্রাসিয়াবের বংশধর বলে দাবী করেন।

পারসিক দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে দরবারে তিনি নানা নতুন নিয়মকানুন—যথা, ‘পাইবস্’ (সম্রাটের পদযুগল চুম্বন করা) ও ‘সিজদা’ (সিংহাসনের সামনে নতজানু হওয়া) প্রবর্তন করেন। তিনি উজ্জ্বল পোশাকে সজ্জিত ভীমাকৃতি সশস্ত্র দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে রাজোচিত গাম্ভীর্য-সহ দরবারে আসতেন। দরবারে কোন প্রকার আমোদ-প্রমোদ, হাস্যকৌতুক, মদ্যপান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হয় এবং সেখানে সর্বতোভাবে গাম্ভীর্য বজায় রাখা হত। এইভাবে তাঁর চারপাশে এক অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে তিনি প্রমাণ করেন যে, সুলতান সকলের ঊর্ধ্বে।  


চল্লিশ চক্রের উচ্ছেদ:

ইলতুৎমিসের আমল থেকে গড়ে ওঠা ‘বন্দেগান্-ই-চাহেলাগান্’ বা ‘চল্লিশ চক্র’ বা ওমরাহদের ক্ষমত! ও মর্যাদা খর্ব করার উদ্দেশ্যে তিনি নানা কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। কর্তব্য-কর্মে অবহেলা বা তাঁদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পেলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনচক্ষে তাঁদের হেয় করে তুলতেন—প্রয়োজনে তাঁদের বিষপ্রয়োগে হত্যা করতেও তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। বলা বাহুল্য, তাঁর নিজের এবং নিজ উত্তরাধিকারীদের সিংহাসনের সকল সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অপসারণ ও সিংহাসনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্যই তিনি এই সব কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন।


গুপ্তচর ব্যবস্থা ও সৈন্যবাহিনী সংগঠন:

সাম্রাজ্যের সকল সংবাদ সংগ্রহের জন্য তিনি বহু গুপ্তচর বা ‘বারিদ’ নিযুক্ত করেন। কেবলমাত্র সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই তিনি একাজে নিযুক্ত করতেন। গুপ্তচরেরা কোন সংবাদ দিতে ব্যর্থ হলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। গুপ্তচরের ভয়ে ওমরাহরা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকত। বলা বাহুল্য, এই গুপ্তচররাই ছিল তাঁর স্বেচ্ছাতন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজশক্তির ভিত্তি হল সেনাবাহিনী। এজন্য তিনি নতুনভাবে সেনা-সংগঠন, শৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রধান সেনাবাহিনীকে শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করেন।


মোঙ্গল আক্রমণ: 

সুপ্রাচীন অতীত থেকেই ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল ভারতের নিরাপত্তার পক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সমগ্র সুলতানী যুগ ধরেই মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলরা এই পথে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে দিল্লী সুলতানীর নিরাপত্তা বিঘ্ন করে তুলেছিল। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বলবন কতকগুলি কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। এই অঞ্চলের ভাতিন্দা, সুনাম, সামানা, দীপালপুর প্রভৃতি স্থানের পুরানো দুর্গগুলি মেরামত করে সেগুলিতে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করেন। প্রথমে বিখ্যাত যোদ্ধা শের খাঁ এবং পরে সুলতানের দুই পুত্র মহম্মদ ও বুঘরা খান-কে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। বলা বাহুল্য, এ সত্ত্বেও মোঙ্গলভীতি সম্পূর্ণভাবে নিবারণ করা সম্ভব হয় নি।


সুলতানী যুগের একজন উল্লেখযোগ্য শাসক হিসেবে ভারত ইতিহাসে তিনি এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। বিজেতা হিসেবে নয়—সংগঠক হিসেবেই ইতিহাসে তিনি স্মরণীয়। সুলতানী যুগের এক সংকটময় মুহূর্তে শাসনের গুরু-দায়িত্ব নিয়ে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, স্বার্থান্ধ ওমরাহদের দমন, মোঙ্গল আক্রমণ নিবারণ, সেনাদল সংগঠন, গুপ্তচর বাহিনী গঠন এবং রাজকীয় মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে সুলতানশাহীকে তিনি কেবলমাত্র আশু ধ্বংসের হাত থেকেই রক্ষা করেন নি–পরবর্তীকালে তার বিস্তৃতির পথকেও তিনি সুগম করে দেন।  


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close