শের শাহের শাসন ব্যবস্থার পরিচয় দাও | Regime of Sher Shah Suri


  শের শাহের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো।

ভূমিকা:

শের শাহ মাত্র পাঁচ বছর (১৫৪০-৪৫ খ্রি:) দিল্লির সিংহাসনে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ভারতে স্বল্পকালের জন্য হলেও আফগান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই অল্প সময়কালে তিনি সুশাসক হিসেবে বেশ কিছু অবদান রেখে গেছেন। শাসনব্যবস্থায় শের শাহ কিছু মৌলিক চিন্তাভাবনার প্রয়োগ ঘটান। তিনি প্রাচীন হিন্দু ও মধ্যযুগীয় মুসলমান শাসনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল প্রজাকল্যাণকামী৷


শের শাহের শাসনব্যবস্থা

শাসন সংস্কার: শের শাহ্ যে শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তার দুটি ভাগ ছিল। একটি কেন্দ্রীয় সরকার, অপরটি প্রাদেশিক সরকার।


১. কেন্দ্ৰীয় শাসনবিভাগ: কেন্দ্রীয় শাসন বিভাগের শীর্ষে ছিলেন শের শাহ্ নিজেই। এক্ষেত্রে তাঁকে চারজন ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী সাহায্য করতেন। তারা হলেন দেওয়ান-ই-উজীরৎ, দেওয়ান-ইআর্জ, দেওয়ান-ই-ইন্‌সা, দেওয়ান-ই-রিসালৎ। এ ছাড়া ছিলেন একজন প্রধান বিচারপতি (দেওয়ান-ই-কাজী) ও একটি গুপ্তচর (দেওয়ান-ই-বারিদ)।


২. প্রাদেশিক শাসনবিভাগ: শের শাহের আমলে সরকারই ছিল সর্বোচ্চ প্রাদেশিক বিভাগ। শাসনকাজের সুবিধার জন্য শের শাহ্ সমগ্র আফগান সাম্রাজ্যকে ৪৭টি সরকারে ভাগ করেন। প্রত্যেকটি সরকারকে আবার কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করেন। পরগনাগুলি কিছু গ্রামে বিভক্ত ছিল। গ্রাম ছিল শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর। গ্রামের শাসন চালাত গ্রাম পঞ্চায়েত।


৩. রাজস্ব সংস্কার: শের শাহ্ তাঁর সাম্রাজ্যে জমি জরিপ প্রথার ব্যাপক সংস্কার করেন। জমির উৎপাদিকা শক্তি অনুযায়ী রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। উৎপাদিত ফসলের ১/৩ বা ১/৪ অংশ কর হিসেবে নির্ধারিত ছিল। তিনি ‘পাট্টা’ ও ‘কবুলিয়ৎ’ প্রথা চালু করেন। পাট্টা ছিল নির্দিষ্ট জমিতে সরকার কর্তৃক চাষির অধিকারের স্বীকৃতি। অপরদিকে, কবুলিয়ৎ ছিল কৃষক কর্তৃক সরকারকে রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকারপত্র। ভূমিরাজস্ব ছাড়াও উৎপাদককে আরও দুটি কর দিতে হত। এ দুটি কর ছিল জমি জরিপকারীর প্রাপ্য জরিবানা এবং কর সংগ্রাহকের প্রাপ্য মহসিলানা।


৪. বিচারসংস্কার: শের শাহ সমগ্র সাম্রাজ্যে একই ধরনের আইন ও দণ্ডবিধি চালু করেন। বিচারব্যবস্থায় তিনি নিজে ছিলেন প্রধান বিচারক। দেওয়ানি বিচারের ভার ছিল আমিন, ফৌজদারি বিচারের ভার ছিল কাজি ও মির-ই-আদলের ওপর। চুরিডাকাতির শাস্তি ছিল প্রাণদণ্ড।


৫. সামরিক সংস্কার: শের শাহ তাঁর সেনাবাহিনীতে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখেন। তিনি সেনাবাহিনীতে দাগ, হুলিয়া এবং ঘোড়ার গায়ে চিহ্ন দেওয়ার প্রথা চালু করেন।


৬. জনকল্যাণমূলক সংস্কার: 

১. শের শাহ্ জনগণের যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার্থে পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত ১৪০০ মাইল দীর্ঘ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ করান। ২. তিনি ১৭০০টি সরাইখানা নির্মাণ করে পথিকদের খাদ্য ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন। ৩. আফগান সাম্রাজ্যে সংবাদ আদানপ্রদানের জন্য তিনি সর্বপ্রথম ঘোড়ার পিঠে ডাক চলাচল ব্যবস্থা চালু করেন। ৪. তিনি একটি দাতব্য বিভাগ ছাড়াও বেশ কিছু মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। 


মূল্যায়ন: মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে শের শাহ্ এক সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আকবরের আগে পর্যন্ত এমন জনকল্যাণমুখী, প্রজাহিতৈষী ও ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম শাসন আর দেখা যায়নি।


তথ্য সূত্র:

ইতিহাস শিক্ষক- অষ্টম শ্রেণী | জে মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close