মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলি আলোচনা করো | Reasons For The Fall of The Mughal Empire


মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ | মোগল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের কারণ | মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারণ


ভূমিকা: 

বাবরের প্রচেষ্টায় যে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত (১৫২৬ খ্রি.) হয়েছিল, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭ খ্রি.) পর প্রায় ৫০ বছরের মধ্যেই সেই মোগল সাম্রাজ্যের পতন প্রায় সম্পূর্ণ হয়) মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা শাহজাহানের আমলেই শুরু হয়, যা চরম রূপ নেয় ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর।


মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ: মোগল সাম্রাজ্যের পতনের উল্লেখযোগ্য কারণগুলি হল- 

১. সাম্রাজ্যের বিশালতা: 

আসাম থেকে পশ্চিমে কাবুল এবং উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে মহীশূর পর্যন্ত সুবিশাল মোগল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্যকে দিল্লি থেকে সুষ্ঠুরূপে শাসন করা কোনো একজন শাসকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না) ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী সম্রাটদের অযোগ্যতায় মোগল সাম্রাজ্যের ঐক্য ও সংহতি সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয় ও সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে এগিয়ে যায়।


২. উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব: 

মোগল শাসকরা কোনো উত্তরাধিকার আইন তৈরি করে যাননি। তাই দেখা যায় কোনো সম্রাট মারা গেলে সিংহাসনের দখল নিয়ে তার সব পুত্রই সংঘর্ষে লিপ্ত হতেন। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এইরূপ ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব প্রবল আকার ধারণ করলে সাম্রাজ্যের অবস্থা সংকটজনক হয়ে পড়ে।


৩. জায়গিরদারি সংকট:

ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষ দিকে জায়গিরদারি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এর দরুণ মোগল শাসনব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মনসবদাররা তাদের প্রাপ্ত জায়গির থেকে আদায়ীকৃত রাজস্বের অনেকটাই আত্মসাৎ করে। এ ছাড়াও জায়গিরপ্রাপ্তির জন্য মনসবদারদের মধ্যে দলাদলি শুরু হলে মোগল সাম্রাজ্যের অস্তিত্বে সংকট দেখা দেয়। 


৪. অভিজাতশ্রেণির অবক্ষয়:

প্রথমদিকে যে অভিজাতশ্রেণি ছিল মোগল সাম্রাজ্যের স্তম্ভস্বরূপ, সেই অভিজাতরাই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যের পক্ষে বিপজ্জনক। স্বার্থান্বেষী অভিজাতরা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের মধ্যে দলাদলি শুরু করে ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী সময়ে ইরানি, তুরানি ও হিন্দুস্থানি প্রভৃতি গোষ্ঠীগুলি এভাবেই মোগল সাম্রাজ্যের ভিতকে দুর্বল করে দেয়।


৫. কৃষক বিদ্রোহ: 

জায়গির থেকে আদায় করা রাজস্বে মনসবদারেরা তাদের সামরিক বাহিনীর ভরণপোষণ চালাত। তাই তারা কৃষকদের কাছ থেকে চড়া হারে রাজস্ব আদায় করত, ফলে কৃষকরা অসন্তুষ্ট হত। কৃষকদের এই অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সত্নামী, জাঠ, শিখ প্রভৃতি বিদ্রোহে, যা মোগল সাম্রাজ্যের অস্তিত্বে আঘাত হানে।


৬. সামরিক বিপর্যয়: 

ভারতে যতদিন মোগল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল ততদিনই মোগল সামরিক বাহিনী সক্রিয় ছিল। কিন্তু যখন থেকে যুদ্ধের প্রয়োজন মিটল তখন থেকেই মোগল সামরিক বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকল। এই দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় সেনাবাহিনী নিয়ে ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।


৭. ঔরঙ্গজেবের ধর্মান্ধতা: 

ঔরঙ্গজেবের পরধর্ম অসহিঞ্চুতা অমুসলিম প্রজাদের মোগল সাম্রাজ্যের শত্রুতে পরিণত করে। ঔরঙ্গজেবের ভ্রান্ত একপেশে ধর্মীয় নীতির ফলে রাজপুত রাজন্যবর্গ মোগল শাসকদের প্রতি ক্ষুণ্ন হয়। তাই এই কারণটি মোগল সাম্রাজ্যের পতনে ইন্ধন জোগায়।


৮. বৈদেশিক আক্রমণ:

মোগল সাম্রাজ্যের ওপর শেষ আঘাত হানে পরপর কয়েকটি বৈদেশিক আক্রমণ। নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির নৃশংস ও ভয়ানক আক্রমণ মোগল সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। মোগল সাম্রাজ্যের পতন সম্পূর্ণ হয়। 


তথ্য সূত্র:

ইতিহাস শিক্ষক- অষ্টম শ্রেণী | জে মুখোপাধ্যায়। 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close