সুলতানি যুগে ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ


সুলতানি যুগে ভাষা ও সাহিত্য | সুলতানি যুগে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ | সুলতানি যুগে সংস্কৃত ভাষা 

ভূমিকা:

সুলতানি যুগে ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। দিল্লীর সুলতান ও প্রাদেশিক শাসনকর্তারা শিক্ষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সী এবং দিল্লীর সুলতানরা ফার্সী ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। 


১. ফার্সী ভাষা:

সুলতান ইলতুৎমিসের দরবারে বহু ফার্সী লেখক আশ্রয় গ্রহণ করেন। বলবনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মহম্মদ ফার্সী পণ্ডিতদের অনুরাগী ছিলেন। আলাউদ্দিন খলজীর দরবারেও বহু ফার্সী পণ্ডিতদের সমাবেশ ঘটে। জিয়াউদ্দিন বরণী, মিনহাজ-উস-সিরাজ, শামস-ই-সিরাজ আফিফ প্রভৃতি ঐতিহাসিকের রচনা এই যুগের ফার্সী সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। বিখ্যাত কবি ও সংগীতজ্ঞ আমীর খসরু ছিলেন এই যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। এই যুগের অপর বিখ্যাত কবি ছিলেন হাসান দেহলবী। ফিরোজশাহ তুঘলক ও সিকন্দর লোদীর আমলে বহু সংস্কৃত গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় অনূদিত হয়। বিভিন্ন প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণও ফার্সী ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জিয়া নাকাবি ‘তোতানামা’ নামে একটি সংস্কৃত গল্প-গ্রন্থ সংস্কৃত থেকে ফার্সীতে অনুবাদ করেন। কাশ্মীরের জয়নুল আবেদিনের উৎসাহে রাজতরঙ্গিনী, মহাভারত ও অন্যান্য গ্রন্থ ফার্সীতে অনূদিত হয়।


২. সংস্কৃত ভাষা:

সুলতানি যুগে সংস্কৃত ভাষা কেবলমাত্র পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সংস্কৃত কিন্তু একেবারে অবলুপ্ত হয় নি। হিন্দু রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় এই যুগে দর্শন, কাব্য, নাটক, উপন্যাস, চিকিৎসা, সংগীত, জ্যোতিষ প্রভৃতি বিষয়ে সংস্কৃত ভাষায় বহু গ্রন্থ রচিত হয়। সায়নাচার্য, মাধব বিদ্যারণ্য, পার্থসারথি, বামনভট্ট, রবিবর্মণ, বিজ্ঞানেশ্বর, রূপ গোস্বামী, রঘুনন্দন, জীমূতবাহন, বাচস্পতি মিশ্র, জয়দেব প্রভৃতির রচনা সংস্কৃত সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।


৩. আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ: 

সুলতানি যুগে ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষাগুলি বিকাশ লাভ করতে থাকে। একদিকে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অপরদিকে সর্বসাধারণের বোধগম্য আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক ভাষায় ধর্মপ্রচারকদের বাণী প্রচারের ফলে প্রাদেশিক ভাষাগুলি যথার্থ রূপ ধারণ করতে থাকে। রামানন্দ ও কবীর হিন্দী ভাষায় ধর্মপ্রচার করে হিন্দী ভাষার সম্পদ বৃদ্ধি করেন। মীরার ভজন ও কবীরের দোঁহাগুলি শব্দ-প্রাচুর্য ও ভাবসম্পদে হিন্দী ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। এই যুগেই কবি চাঁদ বরদৈ বিখ্যাত ‘পৃথ্বীরাজ-রাসো’, শাঙ্গধর ‘হাম্মির-রাসো’ মালিক মহম্মদ জয়সী ‘পদ্মাবৎ কাব্য’ এবং জননায়ক ‘অলখানন্দা’ কাব্য রচনা করেন। নানক ও তাঁর শিষ্যদের চেষ্টায় গুরুমখী লিপি ও পাঞ্জাবী ভাষার উন্নতি হয়। নামদেব, জ্ঞানেশ্বর, একনথের দোঁহাগুলি মারাঠী ভাষার ভিত্তি রচনা করে। কানাড়ী, তামিল, তেলেগু ও মালয়ালম ভাষাও এ সময় বিকশিত হয়।  


৪. বাংলা ভাষা:

সুলতানী আমলের প্রাদেশিক ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা ভাষার সর্বাধিক উন্নতি হয়। বাংলা ভাষার উন্নতিতে বৈষ্ণব কবিদের দান অসামান্য। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির রচনা বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করে। বাংলার সুলতান বরবক শাহ, হোসেন শাহ, নসরৎ শাহ এবং পদস্থ রাজকর্মচারী পরাগল খাঁ ও ছুটি খাঁ-এর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যথেষ্ট উন্নতি হয়। বাংলা রামায়ণের রচয়িতা কবি কৃত্তিবাস বরবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহের চেষ্টায় মহাভারত ও শ্রীমদ্ভাগবতের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। কবি কৃত্তিবাস বরবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। হোসেন শাহ ও তাঁর পুত্র নসরৎ শাহের চেষ্টায় মহাভারত ও শ্রীমদ্ভাগবতের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। বাংলার হোসেন শাহী আমলে যশোরাজ খাঁ, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, শ্রীধর প্রমুখ পণ্ডিতরা সরাসরি রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। 


৫. উর্দু ভাষা:

ভারতে আগমনকালে বিদেশী মুসলিমরা আরবী ও ফার্সী ভাষা ব্যবহার করত। কালক্রমে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ফার্সী ও হিন্দীর সংমিশ্রণে উর্দু ভাষার উদ্ভব ঘটে। উর্দু ছিল জনসাধারণের ভাষা। আমীর খসরুর রচনা এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। এ প্রসঙ্গে ওয়ালি, হাতিম, খান-আর্জু প্রমুখের নাম করা যায়।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close