মোগল শাসনতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য | Features of Mughal Regime


 মোগল রাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য | মোগল শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য


ভূমিকা:

প্রায় তিনশো বছর ধরে মোগল শাসকেরা ভারতে রাজত্ব করেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজত্বের সুবাদে মোগলযুগে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে। আবুল ফজল ও বিভিন্ন ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণী থেকে আমরা মোগলযুগের সেইসব বৈশিষ্ট্যগুলির পরিচয় পাই।


মোগল রাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য:

১. শাসনব্যবস্থায় ভারতীয়করণ: 

মোগল রাজতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শাসনব্যবস্থার ভারতীয়করণ ঘটানো। মোগলরা ভারতের বাইরে থেকে এদেশে এলেও তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ভারতীয় কাঠামো ছিল মোগল শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি।


২. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা: 

মোগল শাসকরাই ভারতে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ মেনে শাসন পরিচালনা করেন। ঔরঙ্গজেব ছাড়া প্রথম পাঁচজন মোগল বাদশা ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে এক করে ফেলেননি। মোগল রাজত্বে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের প্রজারাও ছিলেন। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের আগে পর্যন্ত এই ধর্মীয় উদারতা বজায় ছিল।


৩. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা: 

মোগল শাসকদের অধীনেই সর্বপ্রথম ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বে চট্টগ্রাম থেকে পশ্চিমে কাবুল পর্যন্ত এবং উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে কাবেরী নদী পর্যন্ত একই সম্রাটের অধীনে ও একই সাম্রাজ্যের আওতায় রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগল শাসনে ভারতবাসী কাঙ্ক্ষিত প্রশাসন উপহার পেয়েছিল। সাম্রাজ্যের সর্বত্র একই সরকারি ভাষা, একই আইনকানুন ও একই মুদ্রাব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় প্রশাসনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।


৪. সমন্বয়ধর্মী শাসন: 

মোগল শাসনব্যবস্থা মৌলিক ছিল না। ভারতীয় রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশর, ইরাক ও পারস্যের শাসন রীতিগুলির সমন্বয়সাধনের মধ্যে দিয়ে মোগল শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ভারতীয় শাসন ধারার মৌলিক আদর্শগুলিকে গ্রহণ করে বিদেশি রীতির সমন্বয় ঘটানো হয়। 


৫. উদার স্বৈরতন্ত্র:

মোগল রাজতন্ত্রের প্রকৃতি ছিল উদার স্বৈরতান্ত্রিক। মোগল সম্রাটরা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হলেন কখনোই স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না। মোগল শাসকদের আদর্শ ছিল উদার ও প্রজাকল্যাণকামী শাসন।


৬. সামন্ততান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক রাজশক্তি : 

মোগল আমলে সমাজ ছিল সামন্ততান্ত্রিক। আকবরই প্রথম সামন্ততান্ত্রিক কেন্দ্রীয় রাজশক্তির সূচনা ঘটান। মোগল প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি নির্ধারণে আমলা বা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিত। ভর্কিল, উজির, মনসবদার, সুবাদার, কাজি প্রভৃতি উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মতামতকে সম্রাট বিভিন্ন প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্ব দিতেন।


৭. মনসবদারি ব্যবস্থা: 

‘মনসব' কথাটির অর্থ হল পদমর্যাদা। অভিজাতদের ক্ষমতা খর্ব করে মোগল সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলার লক্ষ্যে আকবরই প্রথম মনসবদারি প্রথাকে নতুন রূপে প্রয়োগ করেন। নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্যপালনের মাধ্যমে মনসবদারগণ জমির বন্দোবস্ত বা নগদে বেতন পেতেন। প্রত্যেক মনসবদারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সৈন্য রাখতে হত এবং প্রয়োজনে নিজেদের সৈন্য দিয়ে সম্রাটকে সাহায্য করতে হত। মনসবদারদের নিয়োগ, উন্নতি ও বরখাস্ত সব কিছুই ছিল সম্রাটের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। মোগল প্রশাসনকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনে আকবর মনসবদারি প্রথার বিবর্তন ঘটান।


তথ্য সূত্র:

ইতিহাস শিক্ষক- অষ্টম শ্রেণী | জে মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close