আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ | Causes of The American War of Independence


আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ | আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট | আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি 


ভূমিকা:

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর থেকেই ইউরোপ তথা ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা সেখানে এসে বসবাস করতে শুরু করে। সপ্তদশ শতকের প্রথমদিকে ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট বংশীয় রাজাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বহু ইংরেজ ইংল্যান্ড ছেড়ে আমেরিকায় বসতি স্থাপন করে। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের মধ্যেই সেখানে তারা পরপর তেরোটি উপনিবেশ গড়ে তোলে। ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ওইসব উপনিবেশের অধিবাসীদের ওপর বিভিন্ন সময়ে কর বসালে ঔপনিবেশিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করে।


আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ


পরোক্ষ কারণ:

১. জাতীয়তাবোধের উন্মেষ: 

বহুদিন ধরে মাতৃভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে দূরে থাকায় ঔপনিবেশিকরা আমেরিকার জাতীয়তাবাদকে আপন করে নেয়। টম পেইন, লক প্রমুখ দার্শনিকদের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ঔপনিবেশিকদের মনে মার্কিন জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে।


২. ধর্মীয় বিদ্বেষ: 

সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট বংশের রাজারা পিউরিটানদের ওপর ধর্মীয় অত্যাচার চালালে তাদের অনেকেই আমেরিকার উপনিবেশগুলিতে বসবাস শুরু করে। পিউরিটান ধর্মাবলম্বীরা সেই অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়।


৩. স্বায়ত্তশাসন: 

আমেরিকার তেরোটি উপনিবেশের অধিবাসীরা নিজেদের শাসন নিজেরাই পরিচালনা করত। কিন্তু তাদের সেই শাসনক্ষেত্রে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করলে উপনিবেশবাসীর মনে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আগ্রহ গড়ে ওঠে।


৪. ফরাসি ভীতির অবসান: 

সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে (১৭৫৬-৬৩ খ্রি.) ফ্রান্সের পরাজয়ের পর আমেরিকার উপনিবেশগুলিতে কানাডার ফরাসি ঔপনিবেশিকদের হামলা বন্ধ হয়। আমেরিকার ঔপনিবেশিকদের মন থেকে ফরাসি ভীতি দূর হলে, তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।


প্রত্যক্ষ কারণ—ব্রিটিশের করনীতি ও বিভিন্ন আইন:


১. ন্যাভিগেশন আইন: 

ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস প্রবর্তিত ‘ন্যাভিগেশন আইন’ (১৬৬০ খ্রি.)–এ বলা হয়— (i) আমেরিকার উপনিবেশগুলিতে কোনো কলকারখানা স্থাপন বা তুলোজাত দ্রব্য তৈরি করা চলবে না। (ii) আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশে উৎপাদিত দ্রব্যগুলি ইংল্যান্ডের জাহাজে করেই ইংল্যান্ডে আনা হবে। (iii) ইংল্যান্ডে উৎপাদিত পণ্য ইংল্যান্ডের জাহাজে করেই আমেরিকার উপনিবেশগুলিতে নিয়ে যাওয়া হবে।


২. চিনি আইন: 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্রেনভিল চিনি আইন (১৭৬৪ খ্রি.) জারি করেন। এতদিন ধরে ঔপনিবেশিকরা সপ্তায় ফরাসি উপনিবেশ থেকে চিনি ও ঝোলাগুড় আমদানি করত। কিন্তু ইংল্যান্ড চিনির ওপর কর বসালে ঔপনিবেশিকরা ক্ষুধ হয়।


৩. স্ট্যাম্প আইন: 

ফরাসি ও রেড ইন্ডিয়ানদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য উপনিবেশগুলিতে দশ হাজার ব্রিটিশ সেনা নিয়োজিত ছিল। এদের ব্যয়নির্বাহের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্রেনভিল ‘স্ট্যাম্প আইন’ (১৭৬৫ খ্রি.) জারি করেন। এই আইনে বলা হয় আমেরিকার উপনিবেশবাসীদের সমস্ত দলিলপত্র ও লাইসেন্সে ব্রিটেনের কাছ থেকে কেনা স্ট্যাম্প লাগাতে হবে। এই আইন উপনিবেশবাসীদের ক্ষুব্ধ করে।


৪. ঘোষণার আইন: 

ঔপনিবেশিকরা আন্দোলন শুরু করলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী রকিংহ্যাম স্ট্যাম্প আইন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি ‘ঘোষণার আইন’ (১৭৬৬ খ্রি.) জারি করে আমেরিকার তেরোটি উপনিবেশে চা, কাগজ ও কাচের ওপর কর চাপান। ঘোষণার আইনের পর ঔপনিবেশিকদের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। আন্দোলনের চাপে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থ চা ছাড়া সমস্ত দ্রব্যের ওপর থেকে কর তুলে নেন। তবুও ঘটে যায় বোস্টন টি পার্টি ও বোস্টন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা। অবশেষে আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধিরা জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ (১৭৭৬ খ্রি., ৪ জুলাই) দ্বারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে।


তথ্য সূত্র:

ইতিহাস শিক্ষক- অষ্টম শ্রেণী | জে মুখোপাধ্যায়। 




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close