সমুদ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য বিস্তারনীতি আলোচনা করো | Samudragupta's Imperial Expansion Policy


 সমুদ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যবাদী নীতি | সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যবিস্তার নীতি 

 ভূমিকা:

কেবলমাত্র গুপ্তবংশের ইতিহাসেই নয়—অসামান্য প্রতিভার অধিকারী সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করে আছেন। তাঁর সভাকবি হরিষেণ রচিত ‘এলাহাবাদ প্রশস্তি’ থেকে তাঁর সামরিক প্রতিভা ও রাজত্বকালের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়। এছাড়া, বিভিন্ন শিলালিপি, মুদ্রা ও চৈনিক বিবরণ থেকে তাঁর রাজত্বকালের নানা কথা জানা যায়।


রাজ্যজয়ের উদ্দেশ্য:

দাক্ষিণাত্যের বিস্তীর্ণ স্থানে রাজ্য জয় করেন। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী বলেন যে, সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে ‘একরাট' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা, কারণ বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, শক্তিশালী রাজাদের কর্তব্যই হল ভারতভূমির ঐক্য প্রতিষ্ঠা। ডঃ রোমিলা থাপার-এর মতে, তাঁর রাজ্যজয়ের উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার ও সাম্রাজ্যবাদ। ডঃ গয়াল বলেন যে, দক্ষিণ ভারতের অপরিমিত সম্পদ আহরণ করে একটি বিশাল সেনাদল পোষণ এবং মগধের দরবারের বৈভব বৃদ্ধিই তাঁর লক্ষ্য ছিল।


আর্যাবত ও আটবিক রাজ্য জয়:

এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায যে, তিনি আর্যাবর্তের অচ্যুত, নাগসেন, গণপতিনাগ, রুদ্রদেব, মতিল, নাগদত্ত, চন্দ্রবর্মণ, বলবর্মণ ও নন্দীন প্রভৃতি ন'জন রাজা-কে পরাজিত করে (‘উন্মূলিত’) তাঁদের রাজ্যগুলি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই সব রাজাদের রাজ্য কোথায় ছিল, তা সর্বক্ষেত্রে সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়—তবে মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, তিনি পাঞ্জাব, রাজপুতানা, মালব, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলি অধিকার করেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, তিনি আর্যাবর্তে দু’বার অভিযান প্রেরণ করেন, তবে সকলে এ সম্পর্কে একমত নন। অতঃপর তিনি বর্তমান গাজীপুর থেকে জব্বলপুর পর্যন্ত বিস্তৃত অরণ্য-সংকুল অঞ্চলের আটবিক রাজ্যগুলি জয় করে নিজ রাজ্যভুক্ত করেন। এর ফলে তিনি আর্যাবর্তের এক বিস্তৃত স্থানের অধিপতি হন।


এরপর তিনি ভারতের পূর্ব ধরে অগ্রসর হন। তিনি দাক্ষিণাত্যে (১) কোশলের মহেন্দ্র, (২) মহাকান্তারের ব্যাঘ্ররাজ, (৩) কৌরলের মন্তরাজ, (৪) পিষ্ঠপুরমের মহেন্দ্রগিরি, (৫) কোট্রুরের স্বামীদত্ত, (৬) এরণ্ডপল্লের দমন, (৭) কাঞ্চীর বিষ্ণুগোপ, (৮) বেঙ্গীর হস্তিবর্মণ, (৯) অবমুক্তার নীলরাজ, (১০) পলাক্কের উগ্রসেন, (১১) দেবরাষ্ট্রের কুবের, (১২) কুস্থলপুরের ধনঞ্জয় প্রভৃতি মোট বারোজন রাজাকে পরাজিত করেন। 


বলা বাহুল্য, সমুদ্রগুেপ্তের এই জয় কেবলমাত্র পূর্ব দাক্ষিণাত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল—তিনি পশ্চিম দাক্ষিণাত্যে যান নি। সামরিক খ্যাতির মোহে তিনি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা পরিহার করেন নি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মগধ থেকে সুদূর দাক্ষিণাত্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব নয়। এই কারণে তিনি দাক্ষিণাত্যের রাজন্যবর্গের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে তাঁদের নিজ নিজ রাজ্য ফিরিয়ে দেনপরিমোক্ষ' বলে বর্ণনা করেছেন। ‘গ্রহণ’ বলতে প্রথমে তিনি ‘মোক্ষ’ বা মুক্তি দেন। সর্বশেষে ‘অনুগ্রহ’ অর্থাৎ পরাজিত দেন। তিনি কিন্তু কখনই পরাজিত শত্রুকে ‘শ্রী’ বা কাছ থেকে কর গ্রহণ ও আনুগত্যের । হরিষেণ সমুদ্রগুপ্তের এই নীতিকে ‘গ্রহণ শত্রুকে পরাজিত ও বন্দী করেন, তারপর শত্রুর বশ্যতা লাভ করে তার রাজ্য ফিরিয়ে সার্বভৌম ফিরিয়ে দেননি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close