আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের ফলাফল | Results of Alexander's invasion of India


আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের ফলাফল/ তাৎপর্য

দিগ্বিজয়ের পরিকল্পনা নিয়ে আলেকজান্ডার ভারতবর্ষে পদার্পণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। উত্তর-পশ্চিম ভারত, সিন্ধু উপত্যকা ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ জয় করলেও ভারতে তাঁকে কোন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হতে হয়নি। তাঁর ভারত ত্যাগের দু’বছরের মধ্যেই তাঁর অধিকৃত স্থানগুলি ভারতীয়রা পুনরুদ্ধার করে নেয়। 


প্রত্যক্ষ ফলাফল:

আলেকজান্ডারের আক্রমণের প্রত্যক্ষ ফল ছিল নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। একমাত্র লুণ্ঠন, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংস ছাড়া ভারতীয় সমাজ, সভ্যতা, ধর্ম, রণনীতি এবং জনজীবনের কোন ক্ষেত্রেই তাঁর আক্রমণের কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। সমকালীন কোন ভারতীয় সাহিত্য বা লোককথায় তাঁর আক্রমণের সামান্যতম কোন উল্লেখ নেই।

আলেকজান্ডারের আক্রমণের ফলে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আলেকজান্ড্রিয়া, বুকেফালা, নিকাইয়া, সোগডিয়া প্রভৃতি কয়েকটি গ্রীক বা যবন উপনিবেশ গড়ে ওঠে। তিনি এগুলিকে প্রাচ্যপাশ্চাত্যের মিলনক্ষেত্র রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এগুলি অল্প দিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়। অনেক ঐতিহাসিক আলেকজান্ডারের আক্রমণকে তাই একটি ‘নিষ্ফল ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন।



পরোক্ষ ফলাফল:

প্রত্যক্ষ ফল অপেক্ষা আলেকজান্ডারের আক্রমণের পরোক্ষ ফল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 


(১) আলেকজান্ডারের আক্রমণ পরোক্ষভাবে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রসারিত করে। তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্যগুলিকে ধ্বংস করে এক শাসনাধীনে এনেছিলেন এবং এই কারণেই পরবর্তীকালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পক্ষে উত্তর ভারতে এক অখণ্ড সাম্রাজ্য স্থাপন করা সহজতর হয়েছিল। ঐতিহাসিক ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী বলেন যে, “ইংলন্ডের ইতিহাসে ডেন আক্রমণের ফলে যেমন ওয়েসেক্স রাজ্যের উদ্ভব হয়, সে-রকম আলেকজান্ডারের আক্রমণের ফলে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতের ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।”


(২) আলেকজান্ডারের আক্রমণের ফলে প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সরাসরি যোগাযোগের জন্য তিনটি স্থলপথ ও একটি জলপথ আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে দুই মহাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘনিষ্ঠতর ও ব্যাপকতর হয়। 


(৩) ভারতীয় মুদ্রাব্যবস্থা, বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও ধর্মের ওপর বহুল পরিমাণে গ্রীক প্রভাব দেখা যায়। ইতিপূর্বে ভারতীয় মুদ্রায় কোন শিল্প-নৈপুণ্য বা রুচির পরিচয় ছিল না। গ্রীকদের সংস্পর্শে এসে গ্রীক মুদ্রার অনুকরণে ভারতীয় মুদ্রায় সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য দেখা যায়। এই সর্বপ্রথম মুদ্রায় রাজার নাম, প্রতিকৃতি, উপাধি প্রভৃতি খোদাই করার রীতি প্রচলিত হয় এবং ভারতীয় মুদ্রা ব্যবস্থায় সম্প্রদায়ের মধ্যেও


এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। মহাযান ধর্মমতে যে পৌত্তলিকতার প্রভাব দেখা যায় তা গ্রীক পৌত্তলিকতারই প্রভাব বলে মনে করা হয়। গ্রীক ও রোমান শিল্পরীতির প্রভাবেই ভারতে ‘গান্ধার শিল্প’ গড়ে ওঠে। পাটলীপুত্রে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের কাঠের প্রাসাদ, অশোকের স্তম্ভগুলি ও তার গাত্রে বিভিন্ন লিপিগুলি গ্রীক প্রভাবের ফল। ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রেও গ্রীক প্রভাব দেখা যায়। বরাহমিহিরের ‘পঞ্চসিদ্ধান্ত' গ্রন্থে গ্রীক জ্যোতির্বিদ্যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় নাটকে ‘যবনিকা’ বা পর্দার ব্যবহার গ্রীক প্রভাবের ফল বলেই মনে করা হয়। ঐতিহাসিক স্মিথ ভারতীয় সভ্যতায় সকল গ্রীক উপাদানকে আলেকজান্ডারের আক্রমণের পরোক্ষ ফল বলে মনে করেন। 


(৪) অপরপক্ষে, ভারতীয় গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র প্রভৃতিও পাশ্চত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছিল। তপশ্চর্যায় বিশ্বাসী খ্রিস্টান বৌদ্ধধর্মের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close