জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের সম্পর্ক আলোচনা করো | Nationalism and Internationalism


জাতীয়তাবাদ কী আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী | জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের সম্পর্ক | একাদশ শ্রেণী রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন | Class 11 Political Science Suggestion


ভূমিকা:

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতা হল বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাজগতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুটি বিষয় ও আনুষঙ্গিক বিষয়ের আলোচনা গত শতাব্দী থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার ব্যাপক উন্নতি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, আণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা ও আতংক, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবসভ্যতার অস্তিত্বরক্ষা প্রভৃতি বহু ও বিভিন্ন কারণে জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতার সমস্যাটি এখন বহু-আলোচিত।


১. জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের পারস্পরিক সম্পর্ক: 

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক চলছে শতাধিক বছর ধরে। অনেকের মতে, জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের শত্রু। আবার অনেকে এই মতের বিরোধিতা করে বলেন জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের শত্রু নয় বরং পরস্পরের পরিপূরক। যাঁরা মনে করেন এই দুটি ধারণা একে অপরের শত্রু তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন—রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, গার্নার, ল্যাস্কি প্রমুখ। অপরদিকে ম্যাৎসিনি, জির্মান, রাসেল প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ পরস্পরের পরিপূরক।


২. ‘জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতার শত্রু’—একটি মত: 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ মনীষী জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন। এঁদের মতানুসারে জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় রাষ্ট্র সম্পর্কিত যাবতীয় ধারণার অবলুপ্তি আবশ্যক। তা না-হলে যুদ্ধের আশঙ্কা দূর করা যাবে না। জাতীয় রাষ্ট্রগুলির অস্তিত্ব এবং তাদের জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণার জন্যই পৃথিবীতে যুদ্ধের আবহাওয়া ও মানবসভ্যতার সংকট সৃষ্টি হয়। 


৩. জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বিশ্ব যুদ্ধের মূল কারণ নয়: 

জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতা সম্পর্কিত উপরিউক্ত আলোচনা সর্বাংশে সত্য নয়। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিশ্বের যাবতীয় অশান্তি ও সংঘর্ষের কারণ হিসাবে দায়ী করা যায় না। জাতীয়তাবাদের জন্যই বিশ্বযুদ্ধ দু’টি ঘটেছে, একথা ঠিক নয়। স্বদেশ ও স্বজন-প্রীতিকে মহাযুদ্ধের কারণ এবং মানবসভ্যতার সংকটের কারণ হিসাবে নির্দেশ করা যুক্তিযুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠা করলেই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে—একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। পুরোপুরি জাতীয় রাষ্ট্রগুলির অস্তিত্বের বিলোপ সম্ভব নয় এবং কাম্যও নয়।


৪. পরস্পরের শত্রু নয়: 

ম্যাৎসিনি, জিমার্ন, রাসেল প্রমুখের মতে, সাধারণভাবে জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের শত্রু নয়। কারণ আদর্শ জাতীয়তাবাদের মূলকথা হল ‘নিজে বাঁচো এবং অপরকে বাঁচতে দাও’। এদিক থেকে উভয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। তবে জাতীয়তাবাদ উগ্র ও বিকৃত রূপ ধারণ করলে তা আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী হয়ে ওঠে।


৫. বিকৃত জাতীয়তাবাদই হল আন্তর্জাতিকতার শত্রু:

জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয় নবজাগরণের যুগে। তারপর ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বৈপ্লবিক অধিকার ও স্বাধীনতাবোধের ভিত্তিতে তা পরিণতি লাভ করে। সামন্ততান্ত্রিক যুগের পর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই জাতীয়তাবাদ বিকৃত বা উগ্র রূপ ধারণ করে। তখন অর্থনৈতিক স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিকতার সৃষ্টি হয়। বৃহৎ ও শক্তিধর জাতিগুলি দুর্বল ও ক্ষুদ্র জাতিগুলির উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এক হীন ও হিংস্র প্রতিযোগিতার সামিল হয়। এই পথেই দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ ও বিকৃত রূপ ধারণ করে এবং সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়।


৬. পরস্পরের পরিপূরক: 

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ হল পরস্পরের পরিপূরক। আন্তর্জাতিকতাবাদের উদ্দেশ্য হল জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা, জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি ঘটানো। জাতিগত বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করা নয়, বরং জাতিগুলির বিকাশের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিকতাবাদের বিকাশ ঘটতে পারে। আবার আদর্শ জাতীয়তাবাদের অর্থ হল নিজে বাঁচো ও অপরকে বাঁচতে দাও। এই জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিপন্থী নয়। পরিবর্তে জাতি-রাষ্ট্রগুলির বিকাশের মধ্য দিয়েই বিশ্বসভ্যতার বিকাশ ঘটতে পারে। কাজেই বিকৃত জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের শত্রু হলেও, আদর্শ জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ পরস্পরের পরিপূরক। জিমার্নের মতে, জাতীয়তাবাদের পথ বেয়েই আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছোনো সম্ভব। আর আন্তর্জাতিকতাবাদের বিকাশ জাতি-রাষ্ট্রগুলির বিকাশের ওপর নির্ভরশীল।


উপসংহার: 

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতার মধ্যে সমন্বয় সাধন জাতীয় রাষ্ট্রগুলির পক্ষে এখনও সম্ভব হয়নি। জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতার মধ্যে সমন্বয় সাধনের আন্তরিক চেষ্টা জাতীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বড়ো একটা দেখা যাচ্ছে না। সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার সুমহান আদর্শকে গ্রহণ করতে জাতীয় রাষ্ট্রগুলি পারছে না। আন্তর্জাতিকতা সার্বজনীন আদর্শ হিসাবে এখনও তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। জাতীয় রাষ্ট্রগুলি আন্তর্জাতিকতার আদর্শের পরিবর্তে তাদের সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ অনুসরণের ব্যাপারে অধিক আগ্রহী। জাতীয় রাষ্ট্রগুলির এইরকম দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, আন্তর্জাতিক সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্ব প্রভৃতি ধারণাগুলি যথাযথভাবে কার্যকর হতে পারছে না। এই কারণে মানবসভ্যতা এখনও সংকটমুক্ত নয়।


তথ্য সূত্র:

১. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

২. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সহায়িকা | Tallent Booster | ড. চণ্ডীদাস মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close