গুপ্তযুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয় কেন | Golden Age of Gupta Period


 গুপ্তযুগকে সুবর্ণ যুগ বলা যায় কী?

ভূমিকা:

প্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে গুপ্তযুগ এক গৌরবময় অধ্যায়। এই যুগে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা, ধর্ম—জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এক অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। গুপ্তযুগকে এইজন্য অনেকে ‘সুবর্ণ যুগ’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। ঐতিহাসিক বার্নেট গুপ্তযুগকে গ্রীসের ইতিহাসের পেরিক্লিসের যুগ, রোমের ইতিহাসের আগস্টাসের যুগ এবং ইংলণ্ডের এলিজাবেথের যুগ-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। 

গুপ্তযুগকে সুবর্ণ যুগ বলা বলার কারণ:

ঐতিহাসিক স্মিথ-এর মতে, প্রধানত বৈদেশিক সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের ফলেই এই সুবর্ণ যুগের উত্থান সম্ভব হয়েছিল। বলা বাহুল্য, স্মিথের এই বক্তব্য সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ গুপ্তযুগের এই সাংস্কৃতিক বিকাশে গ্রীক, রোমান ও চৈনিক প্রভাব কিছু থাকলেও তা কখনই প্রধান নয়। মৌর্যোত্তর যুগে শুঙ্গ শাসনাধীনে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের সূচনা, গুপ্তযুগে রাজনৈতিক ঐক্য, সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা, দেশের আভ্যন্তরীণ শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং রাজন্যবর্গের উদারতা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাই হল গুপ্তযুগের এই সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের কারণ।

১. সাহিত্য:

সাহিত্যের ক্ষেত্রে গুপ্তযুগে বিশেষ উন্নতি ঘটে। সংস্কৃত ভাষাই ছিল এই যুগে সাহিত্যের মাধ্যম, তবে এই যুগকে ‘সংস্কৃত ভাষার পুনরুত্থানের যুগ' হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না, কারণ মৌর্য যুগে সংস্কৃত ভাষা রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হলেও, সংস্কৃত কিন্তু কখনও অবলুপ্ত হয় নি। সংস্কৃত সাহিত্যে এই যুগে নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভার আবির্ভাব হয়। সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত সুপণ্ডিত ও সুসাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘কবিরাজ’ বা শ্রেষ্ঠ কবি। ‘এলাহাবাদ প্রশস্তি’-তে তাঁর সভাকবি হরিষেণের কবি-প্রতিভার স্বাক্ষর ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী বীরসেন-ও একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। গুপ্তযুগকে ভারতীয় দর্শন ও ধর্মশাস্ত্র রচনার স্বর্ণযুগ বললে অত্যুক্তি হয় না। বিশিষ্ট দার্শনিক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান-এর মতে, দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে এই যুগে বহু মৌলিক তত্ত্বের সৃষ্টি হয়। যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি, কাত্যায়ন-স্মৃতি, ব্যাসস্মৃতি, বৃহস্পতি-স্মৃতি, দেবল-স্মৃতি, নারদ-স্মৃতি প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্রগুলি এই যুগে রচিত হয়। অষ্টাদশ পুরাণের বেশ কয়েকটি এই যুগে পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত হয় এবং রামায়ণ ও মহাভারত তাদের বর্তমানরূপ পরিগ্রহ করে। 

২. বিজ্ঞানচর্চা:

গুপ্ত যুগে চিকিৎসাশাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জ্যোতিষচর্চা—মনীষার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। ধন্বন্তরী ও বাগভট্ট এই যুগেই তাঁদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত গ্রন্থগুলি রচনা করেন। অনেকের ধারণা যে, বিখ্যাত শল্যবিদ সুশ্রুত এই যুগের মানুষ ছিলেন। সেনাবাহিনীর সুবিধার্থে এই যুগেই প্রথম পশু চিকিৎসা সম্বন্ধে গ্রন্থ রচিত হয়। ধাতুবিদ্যা সম্পর্কিত জ্ঞানের যথেষ্ট উন্নতি হলেও এই যুগের বিশেষ কোন ধাতুনির্মিত দ্রব্য মেলে নি। দিল্লীর নিকটে প্রাপ্ত মেহেরৌলি লৌহস্তম্ভটি আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এই স্তম্ভের গায়ে আজও কোন মরচে পড়ে নি বা এর মসৃণতা সামান্যতম নষ্ট হয় নি। নালন্দায় প্রাপ্ত তাম্রনির্মিত বুদ্ধমূর্তিটি, বিভিন্ন রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রা এবং শীলমোহরের মধ্যেও ধাতুবিদ্যার উন্নতির নিদর্শন পাওয়া যায়। পিথাগোরাসের থিয়োরেম এবং ত্রিকোণমিতির ‘সাইন’, ‘কোসাইন’ প্রভৃতি চিহ্নের সঙ্গে ভারতীয়রা পরিচিত ছিলেন। ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যার আবিষ্কার ও শূন্যের ব্যবহার, যা বিজ্ঞানের সব দিকেই ভারতীয়দেরই সৃষ্টি।

৩. ধর্ম:

গুপ্ত যুগকে অনেকে ‘হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের যুগ’ বলে চিহ্নিত করেন। বলা বাহুল্য, এ মত ঠিক নয়। পুনরুত্থানের যুগ নয় বরং এই যুগকে হিন্দুধর্মের পুনর্গঠনের যুগ বলা যেতে পারে। হিন্দুধর্ম কখনই অবলুপ্ত হয় নি। মৌর্যযুগে সাময়িকভাবে তা স্তিমিত হয়ে পড়লেও, গুপ্ত যুগের বহু পূর্বেই তার অগ্রগতির সূচনা হয়। প্রাচীন বৈদিক ধর্ম এই যুগে নানাভাবে পরিবর্তিত হয়। এই যুগে বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র তাঁদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেন এবং শিব, বিষ্ণু, কার্তিক, গণেশ, দুর্গা, কালী, লক্ষ্মীর উপাসনা শুরু হয়। তাঁদের পূজার জন্য নতুন নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি রচিত হয়। বৈদিক যাগযজ্ঞের গুরুত্ব কমে আসে এবং ভক্তিমূলক ধর্মের বিকাশ ঘটে।  

৪. স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা:

স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা প্রভৃতির দিক থেকেও গুপ্তযুগ এক সৃজনশীল যুগ। এই যুগে পূর্ববর্তী স্থাপত্য রীতির চরম বিকাশ ও নতুন রীতির সূচনা দেখা যায়। পাথর কেটে বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু গুহামন্দির স্থাপন এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অজন্তা, ইলোরা, উদয়গিরির গুহামন্দিরগুলি - এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মন্দির স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও গুপ্তযুগ এক নবযুগ। গান্ধার শিল্পের প্রভাব খর্ব করে এই যুগে ভাস্কর্যের এক নতুনরীতি গড়ে ওঠে। সারনাথের প্রাপ্ত বুদ্ধমূর্তি হল এই যুগের ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।চিত্রশিল্পের ইতিহাসেও এই যুগ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্ণে ও রেখায়, ভাবে ও ব্যঞ্জনায় এগুলি অতুলনীয়। জলরঙে অংকিত অজন্তা ও ইলোরার প্রাচীর চিত্রগুলি বিশ্ববিখ্যাত।


উপরিউক্ত তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে কিছু ঐতিহাসিক গুপ্তযুগকে 'সুবর্ন যুগ' বলে অভিহিত করেছেন। তবে সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু পরিবর্তন সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এই যুগকে 'সুবর্ন যুগ' বলা যায় না। কারণ সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পাশাপাশিই ছিল অবক্ষয় ও দুর্দশার চিত্র। না, সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে গুপ্তযুগকে ‘সুবর্ণ যুগ’ বললেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কখনই তা ঠিক নয়।


তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close