সমুদ্রগুপ্তের কৃতিত্ব আলোচনা করো | Samudragupta's Achievement


সমুদ্রগুপ্তের কৃতিত্ব | সমুদ্রগুপ্তের কার্যাবলী 


কেবলমাত্র গুপ্তবংশের ইতিহাসেই নয়—অসামান্য প্রতিভার অধিকারী সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করে আছেন। তাঁর সভাকবি হরিষেণ রচিত ‘এলাহাবাদ প্রশস্তি’ থেকে তাঁর সামরিক প্রতিভা ও রাজত্বকালের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়। এছাড়া, বিভিন্ন শিলালিপি, মুদ্রা ও চৈনিক বিবরণ থেকে তাঁর রাজত্বকালের নানা কথা জানা যায়।

ঐতিহাসিক স্মিথ সমুদ্রগুপ্তকে ‘ভারতীয় নেপোলিয়ন' (Indian Napoleon) বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলা বাহুল্য, সমুদ্রগুপ্ত সম্পর্কে এ ধরনের অভিধা সর্বাংশে যুক্তিযুক্ত নয়। ডঃ রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়-এর মতে তাঁর সাম্রাজ্যে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র, দক্ষিণে নর্মদা এবং উত্তরে হিমালয় ও কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে কাশ্মীর, পশ্চিম পাঞ্জাব, পশ্চিম রাজপুতানা, সিন্ধু ও গুজরাট বাদে সারা উত্তর ভারত এবং দক্ষিণে উড়িষ্যার ছত্তিসগড় হয়ে পূর্ব উপকূল ধরে তামিলনাড়ুর চিঙ্গলপেট পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তাঁর প্রত্যক্ষ শাসন স্থাপিত ছিল উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ ও বিন্ধ্য অঞ্চলে।  


ঐতিহাসিক স্মিথ-এর মতে, সমুদ্রগুপ্ত ভারত ইতিহাসের একজন অতি উল্লেখযোগ্য ও গুণবান নরপতি চিহ্নিত। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, সমুদ্রগুপ্ত ভারত ইতিহাসে একজন উল্লেখযোগ্য ও চমকপ্রদ ব্যক্তিত্ব। ভারত ইতিহাসে তিনি এক নবযুগের উদ্বোধন করেছিলেন। বৈদেশিক শাসন ও অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের অস্তিত্বের ফলে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য যখন বিনষ্ট, সে রকম এক অবস্থায় সমুদ্রগুপ্ত সামরিক বলের দ্বারা ভারতের এক বিস্তীর্ণ স্থানে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করেন। সামরিক বলের মোহে অন্ধ হয়ে দূরবর্তী অঞ্চলের রাজ্যগুলিকে তিনি কুক্ষিগত করেন নি—বরং তাদের স্বশাসনের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে তিনি নিজ বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বিজিত অঞ্চলে সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করেন। 

কেবলমাত্র যোদ্ধা বা সুশাসক হিসেবেই নয়—–কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর ‘কবিরাজ’ বা শ্রেষ্ঠ কবি উপাধি থেকে কবিরূপে তাঁর অবিস্মরণীয় খ্যাতির পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর মুদ্রায় অংকিত তাঁর বীণাবাদনরত মূর্তি থেকে তাঁর সংগীতানুরাগের কথা জানা যায়। বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত হরিষেণ তাঁর সভাকবি ছিলেন এবং বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুবন্ধু তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। গুপ্ত যুগে বৌদ্ধিক ও জাগতিক সমৃদ্ধির যে চরম বিকাশ পরিলক্ষিত হয় তার সূচনা হয়েছিল সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালেই। এই কারণে ঐতিহাসিক গোখলে তাঁকে ‘প্রাচীন ভারতীয় সুবর্ণ যুগের অগ্রদূত' harbinger of the Golden Age of Ancient India.” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close