জাতীয় জনসমাজের উপাদানগুলি আলোচনা করো | Elements of National Society


জাতীয় জনসমাজ কাকে বলে | জাতীয় জনসমাজের উৎপত্তির প্রধান উপাদানসমূহ আলোচনা করো

জাতীয় জনসমাজের সংজ্ঞা:

কোনো জনসমাজের মধ্যে যখন ঐক্যবদ্ধতা, স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে; তখন ওই জনসমাজ জাতীয় জনসমাজে পরিণত হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ জাতীয় জনসমাজের সংজ্ঞা দিয়েছেন। জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন জনসমাজই হল জাতীয় জনসমাজ।

জাতীয় জনসমাজ গঠনের জন্য দীর্ঘ বিবর্তন ও কতকগুলি উপাদান কার্যকারী ভূমিকা পালন করে। এই উপাদানগুলিকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—(a) বাহ্যিক উপাদান ও (b) ভাবগত উপাদান।

(a) বাহ্যিক উপাদান: বাহ্যিক উপাদানগুলিকে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল-

 ১. বংশগত ঐক্য:

একটি জনসমষ্টি যখন বিশ্বাস করে যে, তাদের শিরা-উপশিরায় একই রক্ত প্রবাহিত এবং তাদের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অভিন্ন তখন তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই স্বজনপ্রীতি দেখা দেয়। বংশগত ঐক্য গভীর জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি করে। হিটলারের সময়কার জার্মান জাতির জাতীয়তাবোধ এবং আর্য জাতি হিসাবে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

২. ভাষাগত ঐক্য:

মানুষের মনোজগতের ভাবসমূহ ভাষার মাধ্যমেই ব্যক্ত হয়। একই ভাষাভাষী জনগণের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান সহজেই হয়ে থাকে। এতে স্বাভাবিকভাবেই এক একাত্মবোধের সৃষ্টি হয়। তাই এক ভাষাভাষীরা খুব সহজেই পরস্পরের মনোরাজ্যের পরিচয় পায় এবং একাত্ম হয়। ভাষাগত ঐক্য জাতীয়তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাম্‌সে ম্যুরএর মতানুসারে জাতীয় জনসমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে ভাষাগত ঐক্য বংশগত ঐক্য অপেক্ষা অধিক সহায়ক।

৩. ভৌগোলিক নৈকট্য: 

একই ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে বসবাস করলে স্বাভাবিক কারণেই অধিবাসীদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভৌগোলিক ঐক্যকে জাতীয় জনসমাজ গঠনের অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করেন না। তাঁদের মতে একই ভূখন্ডে বসবাস করলেই ঐক্যবোধ জন্মাবে এটা বলা যায় না।

৪. ধর্মগত ঐক্য: 

ঈশ্বরের একই রকম আরাধনা জনগণকে সমধর্মবিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ করে। একই উপাসনা পদ্ধতি এই ঐক্যের বন্ধনকে দৃঢ় করে। তার ফলে গভীর জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে এ রকম উদাহরণ আছে। আধুনিক ইতিহাসেও এমন নজির বিরল নয়। ধর্মগত ঐক্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় মুসলমানগণ প্রথমে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চলাকালীন নিজেরা স্বতন্ত্র জাতীয় জনসমাজ হিসাবে সংঘবদ্ধ হয়েছেন এবং পরে পাকিস্তানে নতুন জাতির সৃষ্টি করেছেন।

৫. রাষ্ট্রনৈতিক ঐক্য:

দীর্ঘদিন ধরে কোনো জনসমষ্টি যদি একই সরকারের শাসনাধীনে থাকে তাহলে তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ সৃষ্টি হওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনা থাকে। এই ধরনের রাষ্ট্রনৈতিক ঐক্য অধিবাসীদের মধ্যে একাত্মবোধের সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ শাসন ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। 

৬. অর্থনৈতিক সমস্বার্থ:

অর্থনৈতিক সমস্বার্থ জনগণকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে এবং জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যে অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে জনগণ বিপ্লবের সামিল হয়েছে।জাতীয়তা গঠনের জন্য এই উপাদানও এককভাবে যথেষ্ট নয়। তাহলে পরস্পর-বিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থযুক্ত শ্রমিকশ্রেণি ও পুঁজিপতিরা একই রাষ্ট্রে বসবাস করত না।

(b) ভাবগত উপাদান:

ভাবগত উপাদান সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিমার্ন বলেছেন, যখন কোনো জনসমাজ নিজেদের জাতীয় জনসমাজ বলে মনে করে তখন তা জাতীয় জনসমাজে পরিণত হয়। জাতীয় জনসমাজ গঠনে ভাবগত ঐক্য অত্যন্ত জরুরি উপাদান। বাহ্যিক উপাদান অপেক্ষা ভাবগত উপাদানকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার কারণ জাতীয় জনসমাজ মূলত একটি ভাবগত ধারণা। ধারণা। অতীত, ঐতিহ্য, উচ্ছ্বাস, বিপর্যয় প্রভৃতি ভাবগত কারণে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়, যা থেকে উদ্ভব হয় জাতীয় জনসমাজ। 

শুধুমাত্র জাতীয় জনসমাজ গঠনে নয়, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনেও ভাবগত ঐক্য সবচেয়ে কার্যকারী উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে। গেটেল বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের ঐক্যের ভিত্তি বাহ্যিক নয় সম্পূর্ণ মানসিক। অবশ্য মার্কসবাদীরা ভাবগত ঐক্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না। 

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় ভারতীয় জনসমাজ গঠনে বাহ্যিক ও ভাবগত উভয় ধরনের উপাদানের ভূমিকাই অনস্বীকার্য।


 তথ্য সূত্র:

১. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

২. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সহায়িকা | Tallent Booster | ড. চণ্ডীদাস মুখোপাধ্যায়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close