ত্রিশক্তি সংগ্রামের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো | ত্রিপাক্ষিক সংগ্রাম


ত্রিশক্তি সংগ্রামের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো | ত্রিপাক্ষিক সংগ্রাম | ত্রিশক্তি যুদ্ধ


ভূমিকা:

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুতে উত্তর ভারতের এক বিস্তীর্ণ অংশের রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয় এবং আর্যাবর্তের নানা স্থানে কয়েকটি শক্তিশালী স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এইসব রাজ্যগুলির মধ্যে রাজপুতানা ও মালবের প্রতিহারবংশ এবং বাংলা-বিহারের পালবংশ উল্লেখযোগ্য। এই দুই শক্তি এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটবংশ আর্যাবর্তে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপনে সচেষ্ট হয়। আর্যাবর্তে প্রাধান্য স্থাপনের জন্য তাদের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয় তা ‘ত্রিশক্তির যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই যুগে হর্ষের স্মৃতিবিজড়িত কনৌজ আর্যাবর্তের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু বলে বিবেচিত হত এই কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী তিন শক্তিরই লক্ষ্য ছিল কনৌজ দখল করা।


পাল আধিপত্য:

প্রতিহারবংশীয় বৎসরাজ (৭৭৫-৮০০ খ্রিঃ) রাজপুতানা ও মধ্য-ভারতে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পূর্বদিকে রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হন। এ সময় বাংলার পালরাজা ধর্মপাল (৮১০-৭০ খ্রিঃ) সমগ্র বাংলা ও বিহার জয় করে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। দোয়াব অঞ্চলের এক যুদ্ধে ধর্মপাল পরাজিত হন।  


বৎসরাজের এই জয় কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কারণ রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব ইতিমধ্যে আর্যাবর্তে হাজির হন। তাঁর হাতে বৎসরাজ পরাজিত হন। ধ্রুব-র পক্ষে বেশী দিন আর্যাবর্তে থাকা সম্ভব হয় নি। তিনি দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে ধর্মপাল কনৌজ-সহ উত্তর ভারতের এক বিশাল অংশে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মপালের এই জয়ও স্থায়ী হয় নি। তাঁর রাজত্বকালের শেষ পর্বে বৎসরাজের পুত্র দ্বিতীয় নাগভট্ট (৮০০-২৫ খ্রিঃ) কনৌজ দখল করেন। ধর্মপাল তাঁকে বাধা দিতে অগ্রসর হয়ে মুঙ্গেরের কাছে এক যুদ্ধে পরাজিত হন। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব-র উত্তরাধিকারী তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৩-৮১৪ খ্রিঃ) নাগভট্টকে পরাজিত করেন। ধর্মপাল তৃতীয় গোবিন্দের বশ্যতা স্বীকার করেন। রাষ্ট্রকূটরাজ দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে ধর্মপাল হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।


প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের সাফল্য:

ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০-৫০ খ্রিঃ) প্রতিহাররাজ রামভদ্র এবং তাঁর উত্তরাধিকারী মিহির ভোজ-কে পরাজিত করেন। সম্ভবত রাষ্ট্রকূটরাজ প্রথম অমোঘবর্ষও তাঁর কাছে পরাজিত হন। দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ৮৬০ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূটদের হাতে পালরাজা নারায়ণ পাল (৮৫৪-৯০৮ খ্রিঃ) পরাজিত হন। প্রতিহাররাজ মিহিরভোজ কনৌজ ও বুন্দেলখণ্ড জয় করে মগধের সীমান্তে এসে হাজির হন। পরবর্তী প্রতিহাররাজ মহেন্দ্রপাল-এর আমলে প্রতিহার সাম্রাজ্য গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করে। তিনি বাংলা ও বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পাল রাজ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেন। ৯১৬ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় ইন্দ্ৰ (৯১৪-২২ খ্রিঃ) মহীপাল প্রতিহার-কে (৯১২-৪৪ খ্রিঃ) পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। প্রতিহার-শক্তির উত্থান আর সম্ভব হয় নি। রাষ্ট্রকূটদের সাফল্যে ত্রি-শক্তি যুদ্ধ সমাপ্ত হয়।


ত্রিশক্তি সংগ্রামের ফলাফল:

প্রায় দুইশ’ বছরব্যাপী এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনটি শক্তিই সামরিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের ব্যয়ভারে তিন শক্তিরই অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। কনৌজ দখলের সংগ্রামে ব্যস্ত থাকায় তিন রাজ্যের আভ্যন্তরীণ শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামন্ত রাজাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্রমাগত যুদ্ধ ও সামন্ত শ্রেণীর বিদ্রোহে আর্যাবর্তের ঐক্য প্রচেষ্টা বিনষ্ট হয়। বলা বাহুল্য, আত্মঘাতী সংগ্রামে লিপ্ত তিনটি রাজ্যের পতন ঘটেছিল একই সময়ে ও একই কারণে।


তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close