হিউয়েন সাঙের ভারত বিবরণ কাহিনী | Hiuen Tsang


হিউয়েন সাঙের ভারত বিবরণ কাহিনী

ভূমিকা:

হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ্ ভারতে আসেন। দীর্ঘ চোদ্দ বছর (৬৩০—৪৪ খ্রিঃ) ভারতের নানাস্থানে ভ্রমণ ও অবস্থানের পর তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর ভারত ভ্রমণকথা ভারতীয় ইতিহাসের অমূল্য উপাদান।§ চীনা ভাষায় লিখিত এই ভ্রমণ-বৃত্তান্তটির নাম হল ‘সি-ইউ-কি’। তাঁর বিবরণ থেকে সমকালীন যুগের সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম, জনসাধারণের অবস্থা এবং হর্ষবর্ধনের দিগ্বিজয় ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।


ভারতবাসীর চরিত্র ও জীবযাত্রা:

হিউয়েন সাঙ্ ভারতবাসীর নৈতিক চরিত্রের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ভারতীয়রা সৎ, নম্র, অতিথিপরায়ণ ও ধর্মপ্রাণ ছিল। তারা সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করত। জনসাধারণের মধ্যে বেশভূষার বাহুল্য ছিল না—একমাত্র ধনীদের মধ্যেই বেশভূষা ও অলংকার বহুল প্রচলিত ছিল। এই যুগে নারীর মর্যাদা ও অধিকার যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়। নারীদের শাস্ত্রপাঠ ও বিধবাদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। সে যুগে সতীদাহ প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের মধ্যে পর্দাপ্রথা ছিল না। হিন্দু সমাজে তখন বর্ণপ্রথা প্রচলিত ছিল। নিম্নশ্রেণীর লোকেরা শহর বা গ্রামের বাইরে বাস করত। সমাজে অস্পৃশ্যতার প্রভাব ছিল ব্যাপক।


হর্ষের শাসন:

তিনি হর্ষের শাসনব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রাজা স্বয়ং রাজ্য পরিভ্রমণ করে শাসনসংক্রান্ত সকল বিষয় তত্ত্বাবধান করতেন। গুপ্ত সম্রাটদের মত তাঁরও একটি মন্ত্রিপরিষদ ছিল। তাঁর সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল বিরাট। হিউয়েন সাঙের মতে, হর্ষের পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তীবাহিনীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫০ হাজার, ১ লক্ষ ও ৬০ হাজার। করভার লঘু ছিল। উৎপন্ন শস্যের এক-ষষ্ঠাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হত। বিনা পারিশ্রমিকে কাউকে বেগার খাটান হত না। বণিকরা যাতে রাজকর্মচারীদের দ্বারা অত্যাচারিত না হয়, তার দিকে রাজার প্রখর দৃষ্টি ছিল। দেশে প্রচুর দাতব্য চিকিৎসালয়, অনাথ আশ্রম ও অতিথিশালা ছিল। দেশে দস্যু-তস্করের বেশ কিছু উপদ্রব ছিল। হিউয়েন সাঙ্ স্বয়ং একাধিকবার দস্যুদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন। দণ্ডবিধি ছিল কঠোর এবং অপরাধীর অঙ্গচ্ছেদের ব্যবস্থাও ছিল।


কয়েকটি নগর:

হিউয়েন সাঙের মতে কনৌজ ছিল আর্যাবর্তের সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ নগর—তৎকালীন উত্তর ভারতের প্রাণকেন্দ্র। শহরটির আয়তন ছিল দৈর্ঘ্যে পাঁচ মাইল এবং তা চতুর্দিকে সুউচ্চ প্রাচীর ও পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। বহু বৌদ্ধ মঠ ও হিন্দু মন্দির দিয়ে তিনি কনৌজকে সুসজ্জিত করেন। অন্যান্য জনবহুল নগরের মধ্যে তিনি প্রয়াগ, মথুরা, থানেশ্বর, বারাণসী ও তাম্রলিপ্তি-র কথা উল্লেখ করেছেন।


শিক্ষা:

হর্ষবর্ধন বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি নালন্দা ও তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নালন্দার ছাত্র ও শিক্ষকদের জ্ঞান-গরিমা, উন্নত চরিত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালী আচার্য শীলভদ্র-এর অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁর দৃষ্টি এড়ায় নি। তাঁর মতে নালন্দা ছিল এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার ছাত্রসংখ্যা ছিল দশ হাজার। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্ররা সেখানে সমবেত হতেন। হিউয়েন সাঙ্ নিজেও সেখানে কয়েক বৎসর অধ্যয়ন করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে হর্ষবর্ধন প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও এখানে দর্শন, ব্যাকরণ, গণিত, জ্যোতিষ, আয়ুর্বেদ প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত।


কৃষি, শিল্প ও বানিজ্য-বাণিজ্য:

দেশের অধিকাংশ মানুষ ছিল কৃষিজীবী এবং হিমালয়সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চল ব্যতীত সারা দেশই ছিল উর্বর ও শস্যসমৃদ্ধ। ভারতীয়রা বস্ত্র, হস্তিদন্ত ও অলংকার শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছিল এবং চীন, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। তাম্রলিপ্তি ছিল বাংলার শ্রেষ্ঠ বন্দর।


তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close