শশাঙ্কের নেতৃত্বে গৌড়ের উত্থান আলোচনা করো | শশাঙ্কের কৃতিত্ব


 শশাঙ্কের নেতৃত্বে গৌড়ের উত্থান | শশাঙ্কের কৃতিত্ব |


ভূমিকা:

ষষ্ঠ শতকের প্রথমভাগে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কালে বাংলাদেশে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটেছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথমভাগে এই সব রাজ্যগুলির মধ্যে গৌড়রাজ্য ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। গৌড়রাজ্যের এই খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।


আদি পরিচয়:

ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর মতে, “বাঙালী রাজগণের মধ্যে শশাঙ্কই প্রথম সার্বভৌম নরপতি।” তাঁর প্রথম জীবন বা তাঁর বংশপরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য সেইভাবে পাওয়া যায় না। অনেকের মতে তিনি গুপ্তবংশসম্ভূত ছিলেন এবং তাঁর অপর নাম ছিল নরেন্দ্রগুপ্ত। যদিও এই মত নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। আবার অনেকে ঐতিহাসিক অনুমান করেন যে, তিনি পরবর্তী গুপ্তবংশীয় মগধরাজ মহাসেনগুপ্তের অধীনে সামন্ত ছিলেন। মহাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পর ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই তিনি গৌড়ে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।


সম্রাজ্যের আয়তন:

এই সময় গৌড় বলতে উত্তর ও পশ্চিম বাংলাকে বোঝানো হতো। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। গৌড়ের স্বাধীন নৃপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরেই তিনি রাজ্যবিস্তারে মনোযোগ দেন। বাংলার বাইরে অভিযান পাঠাবার পূর্বে নিশ্চয়ই সমগ্র বাংলার ওপর তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দক্ষিণে দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুরের দাঁতন), উৎকল ও কঙ্গোদ (উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলা) জয় করেন। পশ্চিমে মগধও তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।  


মৈত্রী-জোট:

সমগ্র বাংলা ও বিহার এবং উড়িষ্যার কিছু অংশ জয় করার পর শশাঙ্ক গৌড়ের শত্রু কনৌজের মৌখরী বংশীয় রাজা গ্রহবর্মণ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। গ্রহবর্মণ থানেশ্বরের পুষ্যভূতিবংশীয় রাজা প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রী-কে বিবাহ করেন। মৌখরী ও পুষ্যভূতিবংশের মধ্যে এই বৈবাহিক সম্পর্ক মালবরাজ দেবগুপ্ত-এর পক্ষে অস্বস্তিকর ছিল, কারণ পুষ্যভূতিদের সঙ্গে মালব রাজবংশের বংশানুক্রমিক শত্রুতা ছিল। এই কারণে দেবগুপ্ত শশাঙ্কের সঙ্গে মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হন।


শশাঙ্ক-হর্ষবর্ধন সম্পর্ক:

দেবগুপ্ত ও শশাঙ্ক যৌথভাবে কনৌজ আক্রমণ করেন। গ্রহবর্মণ পরাজিত ও নিহত হন এবং রাজ্যশ্রীকে কারারুদ্ধ করা হয়। থানেশ্বর রাজ প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর পর থানেশ্বরের তরুণ নৃপতি রাজ্যবর্ধন তখন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই যুদ্ধে দেবগুপ্ত পরাজিত ও নিহত হন, কিন্তু রাজ্যবর্ধন আবার শশাঙ্কের হাতে নিহত হন। বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ বলেন যে, শশাঙ্ক বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে এ সম্পর্কে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। 


রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুতে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন এবং শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। শশাঙ্কের শক্তিবৃদ্ধিতে কামরূপ-রাজ ভাস্করবর্মণ ভীত হয়ে হর্ষের সঙ্গে যোগ দেন। বলা বাহুল্য, হর্ষ ও ভাস্কবর্মনের মিলিত শক্তিজোট শশাঙ্কের কোন ক্ষতি করতে পারে নি এবং ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, দণ্ডভুক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন।  


ধর্মমত:

শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন। বাণভট্ট, হিউয়েন সাড্ ও বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে তাঁকে বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাণভট্ট শশাঙ্ককে ‘গৌড়াধম' ও ‘গৌড়ভুজঙ্গ’ বলে অভিহিত করেছেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার ও ডঃ রমাপ্রসাদ চন্দ উপরোক্ত মতামতগুলি গ্রহণ করতে রাজী নন। তাঁদের মতে হর্ষের অনুগত হিউয়েন সাঙ্ ও বাণভট্ট শশাঙ্ক-বিদ্বেষী ছিলেন। হিউয়েন সাঙের রচনা থেকে জানা যায় যে, শশাঙ্কের রাজত্বকালে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল এবং রাজধানী কর্ণসুবর্ণে তাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে


কৃতিত্ব:

তিনিই প্রথম বাংলাকে এক বিশিষ্ট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাঙালী রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই প্রথম আর্যাবর্তে বাঙালীর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন এবং তা আংশিকভাবে কার্যে পরিণত করেন। সুচতুর কূটকৌশলী শশাঙ্ক প্রবল শক্তিশালী হর্ষবর্ধনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় আধিপত্য বজায় রাখেন। তাঁর রাজ্যজয় দ্বারা তিনি যে নীতির পত্তন করেন, তা অনুসরণ করে পরবর্তীকালে পালরাজারা এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন।


তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close