রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বলপ্রয়োগ মতবাদ | Theory of Force


রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত বলপ্রয়োগ মতবাদটি আলোচনা করো | একাদশ শ্রেণী রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন | Class 11 Political Science Suggestion



ভূমিকা:
রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদগুলির মধ্যে অন্যতম হল বলপ্রয়োগ মতবাদ। এই মতবাদে বলপ্রয়োগকে রাষ্ট্রের উৎস ও ভিত্তিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মতবাদের মূলকথা হল বলপ্রয়োগের ফলেই রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে এবং বলপ্রয়োগের উপরই রাষ্ট্রের স্থিরতা ও সংহতি নির্ভর করে। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো মেকিয়াভেলি। এ ছাড়া কোঁৎ, হার্বার্ট স্পেনসার, ট্রিটসকে, লিকক, বার্নহার্ডি, জেঙ্কস্ প্রমুখ চিন্তাবিদদের রচনাতেও এই মতবাদের সন্ধান পাওয়া যায়।

মতবাদের ব্যাখ্যা:
প্রথমে কোনো শক্তিশালী ব্যক্তি শক্তিহীন ব্যক্তি ও দলসমূহকে বশীভূত করেছে। এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে গোষ্ঠীর। তারপর সেই শক্তিধর পুরুষই নেতা হিসাবে, গোষ্ঠীপতি হিসাবে, আধিপত্য কায়েম করেন। কালক্রমে গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এই সংঘর্ষের ফলে দুর্বল গোষ্ঠী বলপ্রয়োগের দ্বারা পদানত হয় এবং শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে উপজাতির। তারপর বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে। তার ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল উপজাতির উপর শক্তিধর উপজাতির প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইভাবে এক-একটি অঞ্চলে এক-একজন দলপতি তাঁর প্রভুত্ব কায়েম করেছেন। এর ফলে দলপতির শাসনাধীনে এক-একটি অঞ্চলে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।

মূল প্রতিপাদ্য বিষয়:
(১) বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে, (২) কর্তৃত্ব কায়েম করার জন্যই বলবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে এবং 
(৩) বলপ্রয়োগ হল রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংরক্ষণের মূল শক্তি।

সমালোচনা: 
বলপ্রয়োগ মতবাদের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক থাকলেও ঐতিহাসিকরা এর বিরূপ সমালোচনাও করেছেন।

১. অগণতান্ত্রিক: 
শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কখনোই সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শাসন ও জনকল্যাণকারী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বলপ্রয়োগ মতবাদে জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। তাই এই মতবাদ অগণতান্ত্রিক।

২. অনৈতিক: 
নৈতিকতার দিক থেকেও এই মতবাদটি সমর্থনযোগ্য নয়। এই মতবাদ পরোক্ষভাবে স্বৈরাচারকে সমর্থন করে। ফলে গণতন্ত্র, ন্যায়, মানবিক অধিকার, স্বাধীনতা প্রভৃতি এই মতবাদে উপেক্ষিত হয়।

৩. বলপ্রয়োগ একমাত্র উপাদান নয়: 
একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনসম্মতি একান্ত প্রয়োজন। শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টি. এইচ. গ্রিন বলেছেন পাশবিক শক্তি নয়, সম্মতিই হচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি ("Will, not force, is the basis of the state.")।

৪. যুদ্ধের সমর্থক: 
বলপ্রয়োগ মতবাদ একটি রাষ্ট্রকে যুদ্ধপ্রবণ করে তোলে, ফলে আন্তর্জাতিক শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৫. মানব প্রকৃতির সঠিক বর্ণনা নেই:
এই মতবাদে মানুষের চরিত্রের শুধুমাত্র হীন দিকগুলিকেই তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং, মানব প্রকৃতি সম্পর্কে এই মতবাদের ব্যাখ্যা ভ্রান্ত।

মূল্যায়ন:
বহু বিরূপ সমালোচনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রতত্ত্বের মতবাদের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। (ক) পাশবিক শক্তি রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। (খ) রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও বলপ্রয়োগের প্রয়োজন আছে। বহিরাক্রমণ প্রতিরোধ ও আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সকল রাষ্ট্রই পুলিশ বাহিনী ও সৈন্যবাহিনী গঠন ও পরিচালনা করে। (গ) সার্বভৌমিকতা হল রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই সার্বভৌমিকতা ক্ষমতার উপর প্রতিষ্ঠিত। ল্যাস্কির মতানুসারে, ‘সামরিক শক্তির মধ্যেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল নিহিত আছে’।


তথ্য সূত্র:
১. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

২. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সহায়িকা | Tallent Booster | ড. চণ্ডীদাস মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close