রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দাও | রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান বা বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো


রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দাও | রাষ্ট্রের প্রধান উপাদানগুলি আলোচনা করো | রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়: 
রাষ্ট্র হল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়। অথচ এ বিষয়েও বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যার শেষ নেই। গ্রিক পণ্ডিত অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্র সম্পর্কে নানা সংজ্ঞা দিয়েছেন। সুল্জে (Schulze) নামে এক জার্মান লেখকের মতানুসারে আজ পর্যন্ত যত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন্মেছেন তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের একটি করে সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন। রাষ্ট্র সম্পর্কে সংজ্ঞার এই বিভিন্নতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। মতের ও সংজ্ঞার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র সম্বন্ধে একটি সুস্পষ্ট ধারণা করা দুরূহ ব্যাপার। তা ছাড়া রাষ্ট্রের সকল সংজ্ঞার অবতারণা অসম্ভব। তবে সুবিদিত কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে।  



অ্যারিস্টটলের মতানুসারে ‘রাষ্ট্র হল স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি’। সিসেরোর মতানুসারে ‘রাষ্ট্র হল অধিকার সম্পর্কে সমচেতনায় এবং পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের জন্য ঐক্যবদ্ধ বিপুল সংখ্যক জনসমষ্টি। 

বিভিন্ন সংজ্ঞা: 
হল্যান্ডের মতানুসারে ‘রাষ্ট্র হল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণের এমন এক বৃহৎ সমষ্টি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা বিরোধীদের উপরে স্থান পায়।’ হলের মতে, রাষ্ট্র হল ‘রাজনীতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত বহিঃশক্তির শাসন থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত জনসমাজ'। উড্রো উইলসনের মতানুসারে ‘রাষ্ট্র হল আইনানুযায়ী সংগঠিত নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিকারী এক জনসমষ্টি’। ওপেনহাইমের মতানুসারে, কোনো একটি দেশে নির্দিষ্ট একটি জনসমষ্টি সার্বভৌম সরকার প্রতিষ্ঠা করে বসবাস শুরু করলে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। মূলত আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাষ্ট্র সম্পর্কিত এই সমস্ত সংজ্ঞার অবতারণা করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ: (Characteristics or Elements of the State)

গার্নার প্রদত্ত সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে রাষ্ট্রের পাঁচটি মূল উপাদানের পরিচয় পাওয়া যায় : জনসমষ্টি, (২) নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, (৩) সুসংগঠিত সরকার, (৪) সার্বভৌমত্ব এবং (৫) স্থায়িত্ব। রাষ্ট্রের বাস্তব অস্তিত্ব প্রথম দুটি উপাদান, অর্থাৎ জনসমষ্টি ও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উপর নির্ভরশীল। অপরদিকে রাষ্ট্রের প্রকৃতিগত অস্তিত্বের ভিত্তি হল সরকার ও সার্বভৌমত্ব। 

১. জনসমষ্টি: 
রাষ্ট্রের প্রথম অপরিহার্য উপাদান রাষ্ট্র একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান। মানুষের জন্যই রাষ্ট্র। তাই জনসমষ্টিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না। জনহীন কোনো অঞ্চলে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হতে পারে না। সুতরাং জনসমষ্টি হল রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ও একটি অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী ব্যক্তিবর্গকে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ে উঠে। রাষ্ট্রের জনসমষ্টিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়ঃ(১)পূর্ণ নাগরিক, (২) অসম্পূর্ণ নাগরিক, (৩) বিদেশি ও (৪) প্রজা।

২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড: 
রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান জনসমাজটিকে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে। বেদুইনদের মতো ভ্রাম্যমান যাযাবর গোষ্ঠীকে নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য আলাদা কোনো রাষ্ট্র ছিল না। তারপর ‘ইজরাইল’ ভূখণ্ড তাদের সংঘবদ্ধভাবে বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট হল। তখনই সৃষ্টি হল ইজরাইল রাষ্ট্রের। সাধারণত এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্রের নামকরণও নির্ধারিত হয়।

৩.সরকার বা শাসনব্যবস্থা: 
রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য জনসমষ্টিকে সুসংবদ্ধ ও রাজনীতিকভাবে সংঘবদ্ধ হতে হবে। সরকারই জনসমাজকে রাজনীতিকভাবে সংগঠিত করে। রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত ধারণা। সরকার ছাড়া রাষ্ট্রের কল্পনা অসম্ভব। সরকার হল রাষ্ট্রের প্রতিভূ এবং রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সাধনের যন্ত্র। গেটেলের মতানুসারে, ‘সরকার হল রাষ্ট্রের একটি সংস্থা বা যন্ত্ৰ’ (Government is the organisation of machinery of the state.'')। উইলোবি বলেছেন, " সরকার হল একটি প্রতিষ্ঠান বা যন্ত্র যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাকে গঠন ও কার্যকর করে।" সুতরাং সরকার হল রাষ্ট্রের এক অপরিহার্য উপাদান।

৪. সার্বভৌমত্ব:
সার্বভৌমিকতা রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং সরকার থাকলেও সার্বভৌমিকতা ছাড়া রাষ্ট্রের সৃষ্টি হতে পারে না। সার্বভৌমিকতা হল রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাষ্ট্রের প্রতি স্বাভাবিক আনুগত্যের শর্ত হল এই সার্বভৌমিকতা। গেটেলের মতানুসারে, ‘সার্বভৌমত্বের ধারণাই হল আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।' সার্বভৌমিকতা হল রাষ্ট্রদেহের প্রাণস্বরূপ। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টের আগে ভারতের একটি জনসমষ্টি, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং সরকার ছিল। তবুও তখন ভারতকে রাষ্ট্র বলা যেত না। কারণ ওই তারিখের আগে ভারতের সার্বভৌমিকতা ছিল না। ওই দিন থেকে ভারত সার্বভৌমিকতার অধিকারী হল এবং রাষ্ট্র অ্যাখ্যা লাভ করল।

৫. স্থায়িত্ব: 
স্থায়িত্ব হল রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্ষণভঙ্গুর কোনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হতে পারে না। রাষ্ট্র সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর একটা ধারাবাহিকতা আছে। রাষ্ট্রের মধ্যে সরকারের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার কোনো ক্ষতি হয় না। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার সামান্য রদবদলের ফলেও রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব বিপন্ন হয় না।

মুল্যায়ন:
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া কোনো দেশ রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হয় না। একটি দেশ তখনই রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হয়, যখন সেই দেশ অন্যান্য রাষ্ট্র কর্তৃক রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে স্বীকৃতি ছাড়া কোনো দেশকে রাষ্ট্র বলা যায় না। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সকল রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু কিছু সংখ্যক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পেলে কোনো দেশ রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হয় না। ইজরায়েল আজও অনেক দেশের স্বীকৃতি পায়নি। যেসমস্ত দেশ ইজরায়েলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি জানায়নি, তাদের কাছে ইজরায়েল রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য হয় না।

তথ্য সূত্র:

উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close