রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য লেখো | Distinction between the State and the Government


রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো | একাদশ শ্রেণী রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন | Class 11 Political Science Suggestion


ভূমিকা:

সাধারণ মানুষ ‘রাষ্ট্র’ ও ‘সরকার’ শব্দ দুটি একই অর্থে ব্যবহার করেন। হবসও অনুরূপ ধারণা পোষণ করতেন। ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই বলতেন, ‘আমিই রাষ্ট্র’। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ‘রাষ্ট্র’ ও ‘সরকার’ শব্দ দুটির একই অর্থে প্রয়োগ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। বস্তুত রাষ্ট্র ও সরকার সমার্থক নয়।


রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য

(১) রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়: 

গার্নারের মতানুসারে রাষ্ট্র হল রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত ব্যক্তি বা সত্তা। সাধারণ প্রয়োজন পূরণের জন্য এর সৃষ্টি। সরকার হল রাষ্ট্রের কার্য সম্পাদনের মাধ্যম।

(২) সরকার রাষ্ট্রের অংশমাত্র:

জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব—এই চারটি মূল উপাদানের সমন্বয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। অর্থাৎ সরকার রাষ্ট্রের অন্যতম একটি উপাদান। সুতরাং সরকার রাষ্ট্রের অংশমাত্র। অংশ যেমন সমগ্র বিষয় হতে পারে না, তেমনি সরকারও রাষ্ট্র হতে পারে না।

(৩) রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশকে নিয়েই সরকার গঠিত হয়: 

রাষ্ট্র গঠিত হয় তার ভৌগোলিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত সমগ্র জনসমষ্টিকে নিয়ে, কিন্তু সরকার গঠিত হয় কেবল শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ে। রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশকে নিয়েই সরকার গঠিত হয়। ভারতের সকল অধিবাসীকে নিয়েই ভারত রাষ্ট্র গঠিত। কিন্তু ভারত সরকার বলতে বোঝায় ভারতের মুষ্টিমেয় শাসকগোষ্ঠীকে।

(৪) রাষ্ট্রের মতো সরকারের কোনো ভৌগোলিক কাঠামো নেই: 

রাষ্ট্র এই ধারণার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ধারণা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত আছে। কিন্তু সরকার বলতে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে বোঝায় না; বোঝায় একটি শাসকগোষ্ঠীকে। ভারত রাষ্ট্র বলতে ভারতের মানচিত্রের কথাই প্রথমে মনে আসে। ভারত সরকার বলতে ভারতের শাসকগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। 

(৫) রাষ্ট্র হল একটি বিমূর্ত বা তত্ত্বগত ধারণা: রাষ্ট্রের এই বিমূর্ত ধারণার বাস্তব প্রকাশ ঘটে সরকারের মাধ্যমে। সরকারের একটি বাস্তব রূপ আছে। রাষ্ট্রের বহিঃপ্রকাশ নেই।  

(৬) সরকার স্থায়ী নয়: 

রাষ্ট্র স্থায়ী, কিন্তু সরকার স্থায়ী নয়। স্থায়িত্ব রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সরকার কিন্তু চিরপরিবর্তনশীল। অপর রাষ্ট্র কর্তৃক বিজিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অটুট থাকে। অপরদিকে নির্বাচন, বিপ্লব প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে সরকারের পরিবর্তন ঘটে।

(৭) রাষ্ট্রের গঠন বা রূপ সকল ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম:

রাষ্ট্র হিসাবে ভারত, পাকিস্তান বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য নেই। কিন্তু সরকার গণতান্ত্রিক, এককেন্দ্রিক, যুক্তরাষ্ট্রীয়, মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত, রাষ্ট্রপতি-শাসিত প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। সরকার নয়। এই

(৮) সরকারের সার্বভৌমত্ব নেই: 

রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সার্বভৌমিকতাই হল রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। সরকারের এই ক্ষমতা নেই। তবে রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসাবে সরকারই রাষ্ট্রের নামে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করে।

(৯) রাষ্ট্রের বিরোধিতা অসম্ভব: 

রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা যায় না। রাষ্ট্রের বিরোধিতা দেশদ্রোহিতার সামিল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের কোনো অভিযোগ থাকে না। তবে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ থাকতে পারে।

(১০) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অধিকারের ধারণা অবাস্তব। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অধিকার থাকতে পারে।

(১১) গার্নারের যুক্তি:

গার্নার রাষ্ট্রের সঙ্গে জীবদেহ ও যৌথ কারবারি প্রতিষ্ঠানের তুলনা করেছেন। মস্তিষ্ক যেমন জীবদেহকে পরিচালিত করে, তেমনি সরকারও রাষ্ট্রকে পরিচালিত করে। সরকার রাষ্ট্রের মস্তিষ্ক স্বরূপ। মস্তিষ্ক দেহের সর্বাধিক মূল্যবান অঙ্গ। এতদ্‌সত্ত্বেও মস্তিষ্ক ও দেহ অভিন্ন নয়। তেমনি সরকারও রাষ্ট্রদেহের মস্তিষ্ক হিসাবে গণ্য হলেও রাষ্ট্র ও সরকার সমার্থক নয়। যৌথ কারবারি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় পরিচালকমণ্ডলীর দ্বারা। তেমনি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সরকারের দ্বারা।

উপসংহার:

বহুত্ববাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতানুসারে রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে উপরিউক্ত পার্থক্যমূলক আলোচনা কৃত্রিমতাপূর্ণ কূট তর্কের ফল। এই শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশের বিরোধী। সাধারণভাবে রাষ্ট্র ও সরকার অভিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু তত্ত্বগত আলোচনায় উভয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা বিশেষ দরকার।


তথ্য সূত্র:


উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close