রাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য | State and other Social Association


রাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য | রাষ্ট্র ও অন্যান্য সামাজিক সংঘের মধ্যে পার্থক্য | একাদশ শ্রেণী রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাজেশন | Class 11 Political Science Suggestion


ভূমিকা:

মানবসমাজ হল বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত অসংখ্য সংঘ-সংগঠনের এক সমষ্টি। সামাজিক জীবনের বহুবিচিত্র প্রয়োজনের পরিতৃপ্তির জন্য এখন মানবসমাজে অসংখ্য সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। সমাজবাসীরা এই সমস্ত সংগঠনের মাধ্যমেই সংঘবদ্ধভাবে জীবন-যাপন করে। সমাজতত্ত্ববিদ্ ম্যাকাইভার- এর মতানুসারে, ‘সামাজিক সংগঠন হল সেই গোষ্ঠী যা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গড়ে উঠে।


রাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য:

১. উৎপত্তিগত পার্থক্য: 

রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে উৎপত্তিগত কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। হাজার হাজার বছরের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সংঘ প্রতিষ্ঠানের জন্য এত দীর্ঘ পরিবর্তনের দরকার হয় না। সামাজিক মানুষ ইচ্ছা করলেই অন্যান্য সংঘ তৈরি করতে পারে। কিন্তু ইচ্ছানুসারে রাষ্ট্র তৈরি সম্ভব নয়।

২. ভূখণ্ডগত পার্থক্য: 

রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে সীমারেখাগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সীমানা থাকে। কিন্তু অন্যান্য সংঘের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে না। এই সমস্ত সংঘ দেশ জুড়েও থাকতে পারে আবার দেশের বাইরেও থাকতে পারে। যেমন রামকৃষ্ণ মিশন, রেডক্রস ইত্যাদি। 

৩. নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র: 

রাষ্ট্র প্রয়োজনে অন্যান্য সংঘগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সংঘ রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বলা হয়।

৪. এক্তিয়ারগত পার্থক্য: 

রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা থাকে। রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যকলাপ এই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা থাকে না। অন্যান্য সংগঠনের কর্মক্ষেত্রের পরিধি এভাবে কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। রেডক্রস, রামকৃষ্ণ মিশন প্রভৃতি সংগঠনের শাখা-প্রশাখা ও কার্যকলাপ সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

৫. নির্দিষ্ট সীমার বাইরে রাষ্ট্র সাধারণত সদস্য সংগ্রহ করে না। সামাজিক সংঘ-সংগঠনসমূহ সমগ্র পৃথিবী থেকে সদস্য সংগ্রহ করতে পারে।

৬. স্থায়িত্বের পার্থক্য:

রাষ্ট্র একটি স্থায়ী সংগঠন; কিন্তু সামাজিক সংগঠনগুলি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সিদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই এই সমস্ত সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটতে পারে। রাষ্ট্র কিন্তু একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। স্থায়িত্ব হল রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৭. উদ্দেশ্যগত পার্থক্য:

অন্যান্য সামাজিক সংগঠনগুলির নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। খেলাধূলা, শিক্ষাবিস্তার, ধর্মপ্রচার প্রভৃতির মধ্যে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই প্রতিটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ব্যাপক ও বহুমুখী। সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল সাধনই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য।

৮. রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি ব্যাপক ও বহুমুখী। তাই রাষ্ট্রের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যায়। অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের এই সমস্ত সমস্যা তত প্রবল নয়। 

৯. রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী:

কেবল রাষ্ট্রেরই সার্বভৌম ক্ষমতা আছে। তাই রাষ্ট্রের নির্দেশই হল আইন। রাষ্ট্রের আইন অমান্য করলে তার জন্য অমান্যকারীকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। এই শাস্তি আর্থিক, দৈহিক, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। এই সমস্ত সংগঠন তাদের সদস্যদের কখনোই দৈহিক শাস্তি দিতে পারে না। খুব বেশি হলে এই সমস্ত সংগঠন তার সদস্যদের সভ্যপদ কেড়ে নিতে পারে।

মূল্যায়ন:

পরিশেষে যায়, রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘের মধ্যে বৈসাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও, বাস্তবে রাষ্ট্র ও যে-কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান যে পরস্পরের পরিপূরক এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সমাজবদ্ধ মানুষের সব রকম দাবি পূরণ করা রাষ্ট্রের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন—নৈতিকতার শিক্ষা, আধ্যাত্মিক দাবি পূরণ, জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা, বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সংস্কারসাধন, স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসারসাধন প্রভৃতি সামাজিক সংঘগুলিই করে থাকে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র অন্যান্য সংঘগুলিকে তাদের কার্যসম্পাদনে সহযোগিতা করে থাকে। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংঘগুলি পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক।


তথ্য সূত্র:

১. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা | অনাদিকুমার মহাপাত্র।

২. উচ্চমাধ্যমিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সহায়িকা | Tallent Booster | ড. চণ্ডীদাস মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close