আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Characteristics of Modern Age


আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | Characteristics of Modern Age



ভূমিকা: 

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ ইউরোপের মধ্যযুগের শেষ গুরুত্বপূর্ণ বছর। ওই বছর অটোমান তুর্কিদের আক্রমণে কনস্ট্যানটিনোপলের পতন হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অবলুপ্তি ঘটে। ধীরে ধীরে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয় ইউরোপ। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে আসে নানা যুগান্তকারী পরিবর্তন। এই পরিবর্তনগুলিই হয়ে ওঠে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য।


আধুনিক যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:


১. যুক্তিবাদ: 

কোনো বিষয়কে অন্ধভাবে না মেনে তাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে যাচাই করে গ্রহণ করার কথা বলা হয় যে মতবাদে র্তা হল যুক্তিবাদ। একাদশ-দ্বাদশ শতকে ইউরোপে ‘স্কুলমেন’ নামে এক দল পণ্ডিত সর্বপ্রথম কোনো কিছুকে গ্রহণ করার আগে যুক্তির আলোকে যাচাই করার কথা প্রচার করতেন। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ইটালিতে আগত মনীষীদের সাহচর্যে এই যুক্তিশীল চেতনা ক্রমশ পুষ্ট হতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের পর থেকে ইউরোপজুড়ে এই যুক্তিবাদের প্রসার ঘটতে শুরু করে। স্কুলমেনদের প্রচারিত এই যুক্তিবাদই হল আধুনিকতার প্রথম সোপান।


২. কৃষির উন্নয়ন: 

আধুনিক যুগের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্য কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন। নবজাগরণের কালে উদ্ভূত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কৃষিক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। উদ্ভব হয় নতুন কৃষিভিত্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির।


৩. বাণিজ্যের বিকাশ: 

ক্রুসেডের পরে ইউরোপজুড়ে ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটে। কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন ব্যাবসাবাণিজ্যের প্রসার ঘটায়। প্রাচ্য দেশগুলি থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠী সম্পদশালী হয়ে ওঠে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ভৌগোলিক আবিষ্কার এবং কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলের ও ঘড়ি প্রভৃতি যন্ত্রের ব্যবহার বাণিজ্যের বিকাশকে সহজ করে। এই সময় থেকে সাগরীয় ব্যাবসাবাণিজ্য মহাসাগরীয় ব্যাবসাবাণিজ্যে পরিণত হয়। ইউরোপের নৌ-শক্তিধর দেশগুলি এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ গড়ে তুললে ইউরোপীয় বাণিজ্যের বিকাশ সহজ হয়।


৪. শিল্পের বিকাশ: 

কৃষি উন্নয়ন শিল্প উন্নয়নের পথকে প্রশস্ত করে। উন্নত মানের উৎপাদন প্রণালী ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হওয়ায় শিল্পজাত পণ্যের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ক্রুসেডের পর সামন্ততন্ত্রের পতন ঘটলে অনেকেই গ্রামের ম্যানর ছেড়ে শহরের বিভিন্ন শিল্পে সর্বক্ষণের জন্য নিযুক্ত হয়। জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটলে চাহিদা অনুযায়ী ইউরোপের শহরগুলিতে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠে।


৫. ধনতন্ত্রের বিকাশ: 

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ভৌগোলিক আবিষ্কারের কল্যাণে ইউরোপে বাণিজ্যিক বিপ্লব ঘটে। বাণিজ্যিক সূত্রে প্রাপ্ত উবৃত্ত অর্থ ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠী বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে।


৬. সামন্ততন্ত্রের পতন: 

আধুনিক যুগের উত্তরণে দ্বাদশ শতক থেকেই সামন্ততান্ত্রিক বন্ধন শিথিল হতে শুরু করে। ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ফলে ইউরোপের প্রচুর সামন্ত ধনে-প্রাণে মারা যান এবং নতুন নতুন নগর ও বন্দরের উৎপত্তি ঘটে। ভূমিদাস প্রথার অবসান হলে এবং বাণিজ্য ও শ্রমশিল্পের প্রসার ঘটলে সামন্তদের অধীনে থাকা চাষিরা কৃষিকাজ ছেড়ে শিল্পকারখানায় নিয়োজিত হয়। ফলে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।


৭. উদারনৈতিক গণতন্ত্র: 

জনগণের দ্বারা নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা যখন বেশিরভাগ মানুষের কল্যাণসাধন করে তখন তা হয়ে ওঠে উদারনৈতিক গণতন্ত্র। ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব ও লেভেলাস আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে, ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় এবং ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে এই ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।


৮. সাম্যবাদী ভাবনা: 

ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানার ভিত্তিতে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও আয় বণ্টনব্যবস্থা সাম্যবাদ নামে পরিচিত। সাম্যবাদের মূল কথা হল সমাজের বিভিন্ন ধরনের শ্রেণি ও গোষ্ঠীগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা গড়ে তোলা। বিশেষত সমাজের দরিদ্র গোষ্ঠীর সর্বাঙ্গীণ কল্যাণসাধন করা। প্রথমদিকে রবার্ট আওয়েন, সেন্ট সাইমন, চার্লস এবং পরবর্তীকালে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস সাম্যবাদী মতাদর্শ প্রচার ফ্যুরিয়র, লুই রাঁ প্রমুখ করেন। 


৯. জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার: 

মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার জ্ঞানচর্চার প্রসারে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটায়। যুক্তিবাদী সাহিত্য ও দর্শন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার ফলে মধ্যযুগীয় স্থবির ও অসার ধর্মতত্ত্ব বর্জিত হয়। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ ও সংস্কারমুক্ত করে।



তথ্য সূত্র:

অষ্টম শ্রেণী ইতিহাস শিক্ষক | জে. মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close