ভারতে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য ও প্রভাব আলোচনা করো | West Bengal HS History Suggestion


ভারতে রেলপথ স্থাপনের ঘটনা এদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছিল | ভারতে রেলপথ স্থাপনের প্রভাব বা ফলাফল


ভূমিকা:

প্রখ্যাত দার্শনিক কার্ল মার্কস ভারতে রেলপথ প্রবর্তনকে আশীর্বাদ মনে করে মন্তব্য করেছিলেন, রেলপথ ভারতে আধুনিক শিল্প স্থাপন ও প্রসারে পথ প্রদর্শক হবে। ড. বিপানচন্দ্রের মতে, রেলপথ নির্মাণ ভারতীয় জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপর এক বৈপ্লবিক প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। তবে রেলপথ প্রবর্তনের কিছু ক্ষতিকারক প্রভাবও লক্ষ করা গিয়েছিল। ভারতে ব্রিটিশ সরকার রেলপথ স্থাপন করেছিল বেশকিছু উদ্দেশ্য নিয়েও।


ভারতে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য

ভারতের কল্যাণসাধন বা আধুনিকীকরণ রেলপথ স্থাপনের পিছনে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একাধিক সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য ছিল। যেমন


১. ব্রিটিশ পুঁজির লগ্নি: 

ভারতে রেলপথ নির্মাণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের অর্থ লগ্নির নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের দরুন ব্রিটিশ শিল্পপতিদের হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত পুঁজি সঞ্জিত হতে থাকে। সেই উদ্বৃত্ত অর্থ কোনো লাভজনক বাণিজ্যে লগ্নি করার জন্য তারা উদ্গ্রীব হয়ে পড়ে তাই তারা সরকারকে ভারতে রেলপথ নির্মাণে চাপ দিতে থাকে।


২. ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ: 

ভারতে রেলপথ স্থাপনের পিছনে ব্রিটিশদের অপর উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা। রেলপথ নির্মাণের দ্বারা কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ প্রভৃতি বন্দরের সঙ্গে এ দেশের কাঁচামাল উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ সাধন করা, অল্প ব্যয়ে কাঁচামাল ইংল্যান্ডে দ্রুত প্রেরণ করা এবং নিজের দেশের উৎপাদিত দ্রব্য ভারতের বাজারে আনা। এভাবে ইংরেজরা রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।


৩. রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: 

সুবিশাল ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক তদারকির জন্য পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর খাদ্য ও রসদ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ারও প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর এই প্রয়োজনীয়তা অধিক অনুভূত হয়েছিল।


৪. সামরিক উদ্দেশ্য: 

ভারতে রেলপথ স্থাপনের পিছনে সরকারের সামরিক স্বার্থচিন্তার দিকটিও জড়িয়ে ছিল। দেশের ভিতরে বিদ্রোহ দমন ও সীমান্তের নিরাপত্তা বিধানের জন্য দ্রুত সৈন্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার রেলপথ স্থাপনে উদ্যোগী হয়। আপাতদৃষ্টিতে ভারতের যেসব স্থানে রেলপথ স্থাপনের বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল না সেসব স্থানের অবশ্যই সামরিক গুরুত্ব ছিল।



ভারতে রেলপথ স্থাপনের প্রভাব 


সুপ্রভাব-


১. পরিবহন ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর: 

ভারতের অনুন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে রেলপথের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রেলপথের প্রবর্তনে পরিবহন ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর হল। জিনিসপত্রাদি কম খরচে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হল।


২. পণ্যদ্রব্যের মূল্য হ্রাস: 

পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানের মধ্যে পণ্যদ্রব্যের মূল্যের মধ্যে যে অসমতা ছিল তা অনেকাংশে কমে গেল। 


৩. ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি:

সুলভ ও সহজে পণ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় ব্যাবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাভ বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।


৪. উৎপাদন ব্যয় হ্রাস ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি:

কম খরচে মাল পরিবহন সম্ভব হয় উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায়। এর ফলে যে অর্থ উদ্বুদ্ধ হল তা অন্যত্র বিনিয়োগ হতে থাকলো।


৫. বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার:

অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। রেলপথের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি-রপ্তানি করা সহজসাধ্য ও সুলভ হল।


৬. কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ: 

রেল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হল, চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন করা প্রভৃতির মাধ্যমে কৃষির উন্নতি ঘটে।


৭. কর্মসংস্থান: 

রেলপথ স্থাপনের ফলে বিরাট সংখ্যক মানুষ কাজের সুযোগ পায়। বাণিজ্যের প্রসারেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।


কুপ্রভাব 

রেলপথ প্রবর্তনের ফলে যেমন সুফল ভারতবাসী ভোগ করেছিল, তেমনি কিছু কুফলও তাদেরকে পীড়িত করেছিল। 


১. ভারতীয় সম্পদের বহির্গমন:

রেলপথের প্রবর্তনের ফলে ভারতীয় সম্পদের বহির্গমনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। ‘গ্যারান্টি প্রথার’ সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলি ইচ্ছামতো অর্থ খরচ করে ভারতীয় রাজস্বের প্রচুর ক্ষতি করে।


২. রেলমাশুলে বৈষম্যমূলক নীতি:

পণ্যদ্রব্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য রেল মাশুলের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়। এর ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 


৩. ইংল্যান্ডে কাঁচামাল সরবরাহ:

রেল ব্যবস্থার প্রসারের ফলে ভারত ইংল্যান্ডের কারখানাগুলির কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে এবং তাদের খোলাবাজারে পরিণত হয়। বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে না পেরে ভারতীয় কুটির শিল্প ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।


৪. ইংল্যান্ডের সবল অর্থনীতি:

ভারতে রেল ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিই সবল হয়ে ওঠে, পক্ষান্তরে ভারতীয় অর্থনীতির কাঠামো দুর্বল হতে থাকে।


উপসংহার:

ভারতের রেলপথ নির্মাণের জন্য যে খরচ বরাদ্দ হয়েছিল খরচ হয়েছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি। ‘গ্যারান্টি’ প্রথার সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ রেল কোম্পানিগুলি সরকারের ধার্য প্রতি মাইলে ৮০০০ পাউন্ডের খরচের পরিবর্তে প্রতি মাইলে ১৮০০০ পাউন্ড অর্থ খরচ করে। এর ফল ভুগতে হয়েছিল সাধারণ ভারতবাসীকে। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে জনগণের ওপর অত্যধিক করভার চাপানো হয়। এভাবে রেলপথের প্রবর্তন ও প্রসার ভারতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন দিকের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।


তথ্য সূত্র:

১. ইতিহাস ও পরিবেশ (Password)

_ কে এম সরিফুজ্জামান।


২. উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস সহায়িকা (দাস | পাহাড়ী) _ talent Booster

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close