বিশ শতকে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা | মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন | Madhyamik History Suggestion


বিশ শতকে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের অবদান | বামপন্থী রাজনীতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য | দশম শ্রেণী ইতিহাস সাজেশন | মাধ্যমিক ইতিহাস বড় প্রশ্ন উত্তর


ভূমিকা:

বিশ শতকের ভারতের উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থী তথা কমিউনিস্ট দলের ভূমিকা ছিল অসামান্য। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে মানবেন্দ্রনাথ রায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। তবে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কানপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।


১. বামপন্থার প্রসার ও দমন:

ক্রমে ক্রমে ভারতে বামপন্থীদের প্রভাব, মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে কংগ্রেসও বামপন্থীদের থেকে দূরত্ব তৈরি করতে থাকে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার প্রচণ্ড দমননীতি গ্রহণ করে বামপন্থার প্রসার রোধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা প্রভৃতির মাধ্যমে বামপন্থী নেতাদের জেলবন্দি করা হয়।


২. মামলার মাধ্যমে বামপন্থীদের দমন: 

এতদ্‌সত্ত্বেও শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশে একের পর এক শিল্প ধর্মঘট হতে থাকে। সরকার ভীত হয়ে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে শিল্পবিরোধ বিলজন-নিরাপত্তা বিল পাশ করে শ্রমিক আন্দোলন ও বামপন্থীদের দমনে অগ্রসর হয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৩৩ জন বামপন্থী নেতাকে গ্রেপ্তার করা শুরু হয় মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা। বিচারে প্রত্যেককে কারাদণ্ডের দণ্ডিত করা হয়।


৩. জাতীয় আন্দোলন থেকে দূরত্বে অবস্থান: 

এর ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিকভাবে বামপন্থীরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাঁরা ক্রমশ জাতীয় আন্দোলন থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে। এসময় তাঁরা তাঁদের নিজস্ব সাংগঠনিক কার্যাবলির ওপর গুরুত্ব দেন। বামপন্থীরা জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ কংগ্রেসীদের ক্ষতিকারক হিসেবে বর্ণনা করে অভিযোগ করেন যে, এঁরা পরোক্ষে ব্রিটিশদের হাতই শক্ত করছে।


বামপন্থীদের এই রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সত্ত্বেও ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। শ্রমিক ধর্মঘটের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। তবে ধর্মঘটি শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমে ক্রমে কমতে থাকে।


৪. বামপন্থীদের ব্রিটিশ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি : 

কিন্তু ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে জার্মানির নাৎসিবাহিনী সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করলে পরিস্থিতি একদম পালটে যায়। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতার কথা ঘোষণা করে। কারারুদ্ধ বামপন্থী নেতৃবৃন্দ একটি ইস্তাহার (Jail Document) প্রকাশের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন জানায়। এভাবে ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ রাতারাতি পরিণত হল ‘জনযুদ্ধে'।


৫. ব্রিটিশ কর্তৃক বামপন্থীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: 

এই ব্রিটিশ আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। কারাবন্দি বামপন্থী নেতৃবৃন্দ সকলে মুক্তিলাভ করে।


৬. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বামপন্থীরা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করে: 

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৯ আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলে কমিউনিস্ট পার্টি পুনরায় এই আন্দোলন থেকে দূরে থেকে ব্রিটিশদের সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। এই আন্দোলনকারীদের তাঁরা ‘উন্মাদ দেশপ্রেমিক’ বলে অভিহিত করে। কংগ্রেসকেও এই আন্দোলন করার জন্য নিন্দা করা হয়। এভাবে বামপন্থীরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি না বুঝে স্রোতের বিপরীতে যেতে থাকে।


৭. বামপন্থী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি:

এতদ্‌সত্ত্বেও কমিউনিস্টদের প্রভাব অভাবনীয়ভাবে বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা গেল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শুরুর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি শ্রমিকশ্রেণির সদস্যসংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়।


৮. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বামপন্থা: 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বামপন্থীদের নেতৃত্বে শক্তিশালী কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন সংঘটিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলার তেভাগা আন্দোলন, দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ প্রভৃতি। এছাড়া বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহে ও আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনানীদের মুক্তির দাবিতে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।


মূল্যায়ন:

ভারতের কমিউনিস্ট তথা বামপন্থী রাজনীতি কখনো ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। বামপন্থী দলগুলির মধ্যে আদর্শগত বিরোধ এবং জাতীয় কংগ্রেসের আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী প্রভাবে বামপন্থীরা কংগ্রেসের বিকল্পরূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।


তথ্য সূত্র:

Advanced ইতিহাস ও পরিবেশ

Password - এ কে এম সরিফুজ্জামান।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close