ভক্তি আন্দোলনের ধারাগুলি আলোচনা করো | Spread of Bhakti movement


ভারতবর্ষে ভক্তি আন্দোলন | ভক্তি আন্দোলনের ধারা | ভক্তিবাদের মূল উৎস | কবীর | গুরুনানক | রামানন্দ | মিরাবাঈ | শ্রীচৈতন্যদেব

ভূমিকা:

ভক্তিবাদের মূল কথা হল আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের মিলন। অনেকে বলেন যে, ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম থেকে হিন্দুধর্মে ভক্তির প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, এই মত গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বেদের অভ্যন্তরেই ভক্তির বীজ নিহিত আছে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিবাদের কথা বলেছেন। জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম—এই তিনটি পথের যে-কোন একটি দ্বারাই মুক্তিলাভ করা যায়। বিষ্ণু পুরাণেও ভক্তিবাদের কথা উল্লিখিত হয়েছে। খ্রিস্টিয় শতাব্দীর সূচনায় মহাযানী বৌদ্ধধর্ম ও পরবর্তীকালে সহজযানী বৌদ্ধধর্মেও ভক্তির কথা বলা হয়েছে। 


খ্রিস্টিয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে দাক্ষিণাত্যেই প্রকৃতপক্ষে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়। শৈব নায়নার এবং বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম থেকে জনসাধারণকে সরিয়ে এনে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা’-র পূজার প্রতি তাদের আকৃষ্ট করা। নায়নার ও আলওয়ার-দের এই ‘সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা’ ছিলেন যথাক্রমে শিব ও বিষ্ণু। পরবর্তীকালে খ্রিস্টিয় চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদ এক ব্যাপক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে।


১. মূল আদর্শ:

ভক্তিবাদের প্রচারকেরা বিশেষ কোন ধর্ম-সম্প্রদায়ের অনুগত ছিলেন না। তাঁরা যাগযজ্ঞ, শাস্ত্রীয় অনুশাসন বা কোন ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ মানতেন না এবং জাতিভেদ ও পৌত্তলিকতার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মনে করতেন যে, ঈশ্বর এক ও অভিন্ন—রাম, কৃষ্ণ বা আল্লাহ্ —যে নামেই তাঁকে ডাকা হোক না কেন। তাঁরা মনে করতেন যে, ভক্তিই ঈশ্বর লাভের একমাত্র উপায় এবং ভক্তি বলতে তাঁরা বুঝতেন কামনা-বাসনা রহিত হয়ে ঈশ্বর-চিন্তা ও জীবে প্রেম। সকল প্রকার সংকীর্ণতা ত্যাগ করে মানুষে মানুষে এবং নারী পুরুষের মধ্যে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাতেও তাঁরা ব্রতী হন। বলা বাহুল্য, হিন্দু-মুসলিম সকলেই এই মতবাদ গ্রহণ করতে পারত। জনৈক রুশ গবেষকদের মতে—‘ঈশ্বরের কাছে সকলেই সমান—ভক্তিবাদের এই সামাজিক সাম্য, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মুসলিমদের আধিপত্য ও হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে আপত্তির প্রতিফলন।


২. রামানন্দ:

মধ্যযুগে ভক্তিবাদকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে যে ব্যাপক ধর্মসংস্কার আন্দোলন দেখা দেয় তাঁর অন্যতম প্রবর্তক ছিলেন রামানন্দ। তিনি প্রয়াগের কাছে মালকোটের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভবত তিনি খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ ও পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে জীবিত ছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক রামানুজের শিষ্য ছিলেন এবং নিজে ছিলেন ‘রামাৎ বৈষ্ণব’ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। বৈষ্ণব সমাজের সাধারণ রীতি অনুসারে রাধাকৃষ্ণের উপাসনা না করে তিনি রাম ও সীতার উপাসনা করতেন। ভগবান রামচন্দ্র ও সীতার উপাসক হলেও তিনি ঈশ্বরের একত্ব প্রচার করেন এবং জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্যই তিনি ভক্তিবাদ প্রচার করেন।


৩. কবীর:

রামানন্দের শিষ্যদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন কবীর এবং তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের সর্বাপেক্ষা উদারপন্থী সংস্কারক। তাঁর জন্ম, মৃত্যু বা প্রাক্‌-সাধক জীবন সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না। কিংবদন্তী অনুসারে তিনি এক বিধবা ব্রাহ্মণীর সন্তান। মাতা-কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে তিনি এক মুসলিম তাঁতীর গৃহে লালিত পালিত হন এবং পরবর্তীকালে তিনি তাঁর পালক-পিতার বৃত্তিই সিকন্দর লোদীর (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রিঃ) সমসাময়িক ছিলেনতাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। গুরু দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি ধর্মপ্রচারে ব্রত হন। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য তিনি স্বীকার করতেন না এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।


৪. দাদু দয়াল:

রামচন্দ্রের উপাসক, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অন্যতম প্রবর্তক এবং বিশিষ্ট কবি দাদু দয়াল বা দাদু (১৫৪৪-১৬০৩ খ্রিঃ)-র জন্ম-বৃত্তান্ত ও জীবন কাহিনী কবীরের মতই রহস্যাবৃত। তাঁর জন্মস্থান আমেদাবাদ না রাজস্থান—তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তাঁর পিতা লোদী রাম একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম ছিলেন এবং পেশায় তিনি ছিলেন ধুনরী। রামানন্দ-গোষ্ঠীর এক প্রবীণ সন্ন্যাসীর কাছে তাঁর দীক্ষা হয়। সম্রাট আকবরের প্রভাবশালী সভাসদ রাজা ভগবান দাস তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রীতে দাদুর সংগে আকবরের সাক্ষাৎ হয়। তিনি বলতেনঃ ‘আমি হিন্দু হতে চাই না, মুসলমান হতে চাই না, ষড়দর্শনের পথ আমার নয়। আমি চাই দয়াময়কে।' তাঁর প্রিয় শিষ্য তিল্য, মোহন দফতরী, রজ্জব দাস, ছোট সুন্দর দাস প্রমুখ তাঁর কবিতা ও বাণীর সংকলন করেছিলেন।


৫. গুরু নানক:

গুরুনানক (১৪৬৯-১৫৩৮ খ্রিঃ) ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মপ্রচারক। ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের লাহোর জেলায় রাভী নদীর তীরে তালবন্দী গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই ধর্মের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল এবং এই ধর্মের আকর্ষণেই তিনি একদিন স্ত্রী-পুত্র ও সকল সাংসারিক বন্ধন পরিত্যাগ করে সত্যানুসন্ধানে বের হন। কথিত আছে, সত্যের সন্ধানে তিনি সুদূর মক্কা ও বাগদাদ ভ্রমণ করেন এবং কালক্রমে পরম সত্যের সন্ধান পান। কবীরের মতই তিনি মূর্তিপূজা তীর্থযাত্রা, জাতিভেদ প্রথা ও ধর্মের বহিরঙ্গতার নিন্দা করতেন। তাঁর মতে ঈশ্বর লাভের কখনই সন্ন্যাস অপরিহার্য নয়। সৎ ও নিরাসক্ত জীবন এবং ঈশ্বরে অবিচল ভক্তির মাধ্যমে গার্হস্থ্য জীবনেও মোক্ষলাভ সম্ভব। এভাবে তিনি আধ্যাত্মিক জীবন ও গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যে এক সমন্বয় সাধনের প্রয়াসী হন।


৬. শ্রীচৈতন্যদেব:

ভক্তিবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রিঃ)। তিনি নবদ্বীপের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাল্যেই ব্যাকরণ, ন্যায়, দর্শন প্রভৃতি নানা শাস্ত্রে গভীর ব্যুৎপত্তি লাভ করে অসাধারণ পণ্ডিত বলে খ্যাতি অর্জন করেন। বাইশ ঈশ্বরপুরী-র কাছে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা লাভ করেন। মূলমন্ত্র বৈরাগ্য, বিশুদ্ধ প্রেম, ভক্তি ও তিনি তৃণের মত নম্র ও নিরহঙ্কারী হওয়ার বছর বয়সে তিনি বৈষ্ণব গুরু চব্বিশ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের জীবে দয়ার আদর্শ প্রচারে ব্রতী হন। তাঁর অনুগামীদের উপদেশ দিতেন। তিনি বলেন যে, ভক্তি ছাড়া জীবের মুক্তি নেই। বাংলাদেশে প্রেম ও ভক্তিমূলক বৈষ্ণবধর্ম প্রচারে তিনি ছিলেন সর্বাগ্রগণ্য। তিনি জাতিভেদ ও ব্রাহ্মণের প্রাধান্য অস্বীকার করে সমগ্র মানবসমাজের জন্য প্রেমধর্ম প্রচার করেন। তিনি মনে করতেন যে, সকল মানুষই সমান আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী এবং ভক্তিভাবের মাধ্যমে মুক্তিলাভ সম্ভব। 

৭. বল্লভাচার্য:

দক্ষিণ ভারতে বৈষ্ণবধর্ম ও ভক্তিবাদ প্রচারে বৈষ্ণবগুরু বল্লভাচার্য-এর অবদান অতি উল্লেখযোগ্য। ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দাক্ষিণাত্যের এক তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে মথুরা ও বৃন্দাবনে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তিনি দাক্ষিণাত্যে প্রেমধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। শ্রীকৃষ্ণের উপাসক বল্লভাচার্য জাতিভেদ মানতেন না। তাঁর মতে সকল জীবই ঈশ্বরের সন্তান। তিনি মনে করতেন যে, শ্রীকৃষ্ণের সেবা ও জীবের প্রতি প্রেম— এই দুটি আদর্শ পালন করলেই মোক্ষলাভ করা যায়। তিনি ভগবদ্গীতা ও ব্রহ্মসূত্রের টীকা এবং ‘শুদ্ধ অদ্বৈত’ নামে একেশ্বরবাদ সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।


৮. মীরাবাই:

মধ্যযুগের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে রাজপুতকূলগৌরব শিশোদীয় পরিবারের বধু মীরাবাঈ এক উল্লেখযোগ্য নাম। মেবারের স্বনামধন্য রাণা সঙ্গের পুত্রবধূ মীরাবাঈ অল্প বয়সেই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন। গিরিধারীর প্রেমে বিভোর হয়ে তিনি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে মথুরা ও বৃন্দাবনে সাধুসঙ্গে কালাতিপাত করেন। তিনি মনে করতেন যে, ভক্তি ও ভালবাসার দ্বারাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা যায়। তাঁর প্রচারের ফলে রাজপুতনায় কৃষ্ণপ্রেমের প্লাবন বয়ে যায়। সংগীতের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ভক্তি-অর্ধও নিবেদন করতেন। ‘মীরার ভজন' নামে পরিচিত তাঁর ভক্তিমূলক গানগুলি আজও ভারতীয় সাহিত্য ও সঙ্গীতের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য।


৯. নামদেব:

পশ্চিম ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন প্রচারে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন মারাঠী ধর্মাচার্য নামদেব। হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের সেতুবন্ধনে তাঁর অবদান অতি উল্লেখযোগ্য। তিনি নীচ বংশোদ্ভূত ছিলেন, কিন্তু ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে তিনি ভক্তিবাদের প্লাবন এনে দেন। জাতিভেদ, যাগযজ্ঞ, ধর্মের বহিরঙ্গতা ও মূর্তিপূজার ঘোরতর বিরোধী নামদেব ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক ও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। তিনি মনে করতেন যে, একমাত্র বিশুদ্ধ ভক্তির মাধ্যমে মুক্তিলাভ সম্ভব। তিনি প্রচার করতেন যে, “ব্রত, উপবাস ও কৃচ্ছ্রসাধনের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই, তীর্থযাত্রাও আবশ্যক নয়। হৃদয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ থেকে সর্বদা হরিনাম গান কর।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close