বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন


বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সামাজিক জীবন | বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক জীবন

সমাজিক জীবন: 

পায়েজ, নুনিজ, নিকলো কন্টি, আবদুর রজ্জাক প্রভৃতি বিদেশী পর্যটকদের বিবরণ থেকে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সমাজ জীবনের নানা তথ্যাদি জানা যায়। সমাজে চতুরাশ্রম প্রথা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। ব্রাহ্মণেরা সমাজে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মীয় জীবনে তাঁদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বেদের বিখ্যাত টীকাকার সায়ন দ্বিতীয় হরিহরের মন্ত্রী ছিলেন। ব্রাহ্মণরা নিরামিষভোজী হলেও, সাধারণ মানুষ মাংস ভক্ষণ করত। গোমাংস নিষিদ্ধ ছিল। কৃষ্ণদেব রায় ও অচ্যুত রায় গোঁড়া হিন্দু ও বিষ্ণুর উপাসক হয়েও পশু-পক্ষীর মাংস ভক্ষণ করতেন। সমাজে সব শ্রেণীর মধ্যে অবাধ মেলামেশা চলত।

সমাজ, রাজনীতি, সামরিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারে নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। তাঁরা কারুশিল্প, চারুশিল্প, নৃত্য, সংগীত, সাহিত্য, কলাবিদ্যা ও শাস্ত্রচর্চা করতেন। গঙ্গাদেবী ও তিরুমালাম্মা ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত কবি। মল্লক্রীড়া ও অসিচালনাতেও তাঁরা পারদর্শিনী ছিলেন। পর্তুগীজ নুনিজ লিখেছেন যে, এখানে কোন কোন নারী প্রহরী, বিচারক (জ্যোতিষী) ও হিসাব রক্ষকের কাজ করতেন- তবে পুরুষের বহুবিবাহ, পণপ্রথা, বাল্য-বিবাহ ও সতীদাহ-প্রথা নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। বিদেশী পর্যটকদের রচনা থেকে দেবরায়, কৃষ্ণদেব রায়, অচ্যুত রায় প্রভৃতি রাজন্যবর্গের বহু পত্নীর অস্তিত্বের কথা জানা যায়। দেবদাসী প্রথা প্রচলিত ছিল।

বিজয়নগরের নৃপতিগণ বিষ্ণুর উপাসক হলেও সকল ধর্মের প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এখানে বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলমান—সকল ধর্মের মানুষই নির্বিবাদে বসবাস করত। শাসনব্যবস্থাতেও তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেন।


সাংস্কৃতিক জীবন: 

মুসলিম শাসনাধীন ভারতবর্ষে হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির মহান কেন্দ্ররূপে বিজয়নগর সাম্রাজ্য খ্যাতি অর্জন করে। রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণ ভারতে সংস্কৃত ভাষা পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং তামিল, তেলেগু, কানাড়ী প্রভৃতি আঞ্চলিক ভাষাগুলিও যথেষ্ট উৎকর্ষ লাভ করে। বৈদিক গ্রন্থের বিখ্যাত টীকাকার মাধবাচার্য ও সায়নাচার্য এযুগেই রাজানুকূল্য অর্জন করেন। দ্বিতীয় দেবরায় সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিখ্যাত কানাড়ী কবি কুমারব্যাস ও তেলেগু কবি শ্রীনাথ তাঁর রাজসভা অলংকৃত করতেন। কবি ও সুসাহিত্যিক কৃষ্ণদেব রায়-এর রাজত্বকাল দক্ষিণ ভারতীয় সাহিত্যের নবযুগ হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর রাজসভায় বহু পণ্ডিতের সমাবেশ ঘটে এবং তিনি নানাভাবে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। কথিত আছে যে, তাঁর রাজসভা ‘অষ্টদিগ্‌গজ’ নামে আটজন সুধী ব্যক্তি দ্বারা অলংকৃত ছিল। 

অষ্টদিগজের শ্রেষ্ঠ দিগ্‌গজ বিখ্যাত তেলেগু কবি পোদ্দান তাঁর সভাকবি ছিলেন। তাঁকে “অন্ধ্ৰ কবিতা পিতামহ” (তেলেগু কাব্যের পিতামহ) বলা হয়। কৃষ্ণদেব রায় নিজে সংস্কৃত ভাষায় পাঁচটি এবং তেলেগু ভাষায় ‘আমুক্ত-মাল্যদা’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। আরবিডু বংশের রাজারাও সাহিত্য, শিক্ষা ও তেলেগু ভাষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই যুগে সংগীত, নৃত্য, নাটক, ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র, দর্শন প্রভৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থ রচিত হয় এবং নাট্যশালার বিকাশ ঘটে। কৃষ্ণদেব রায় ও রাম রায় সংগীতজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।


স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও বিজয়নগর সাম্রাজ্যের যথেষ্ট উন্নতি পরিলক্ষিত হয়।বিজয়নগরের রাজারা স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁরা বহু সুদৃশ্য ও সুরম্য প্রাসাদ, মন্দির ও হর্ম্যাদি নির্মাণ করেন। বিজয়নগরের শিল্প-রীতির একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র ছিল। কৃষ্ণদের রায়ের নির্মিত ‘হাজারা মন্দির’ হিন্দু স্থাপত্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। 'বিঠলস্বামী মন্দির’-এর কারুকার্য আজও মানুষের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কলা সমালোচক ফার্গুসন-এর মতে এই মন্দিরটি দ্রাবিড় স্থাপত্য রীতির অপূর্ব নিদর্শন। পায়েজ-এর মতে, বিজয়নগরের রাজপ্রাসাদটি লিসবনের রাজপ্রাসাদের চেয়েও বড়। চিত্রশিল্প-এর ক্ষেত্রে বিজয়নগর যথেষ্ট উন্নত ছিল।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close