কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের কৃতিত্ব | Achievements of the Kushan Emperor Kanishka


 কুষাণ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে কনিষ্কের অবদান | কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের কৃতিত্ব


ভূমিকা:

বিম কদফিসিসের পর প্রথম কণিষ্ক কুষাণ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। তিনি কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন। তাঁর সিংহাসন আরোহণের তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন মত প্রকাশ করেন। ডঃ ফ্লিট, কানিংহাম প্রভৃতি ঐতিহাসিকদের মতে কণিষ্ক ৫৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন এবং তিনি ‘বিক্রম সম্বৎ’-এর প্রবর্তক। মার্শাল, স্টেন কোনো, স্মিথ প্রভৃতি পণ্ডিতদের মতে তিনি ১২৫ থেকে ১২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সিংহাসনে বসেন। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ৭৮ খ্রিস্টাব্দকে কণিষ্কের সিংহাসন আরোহণকাল বলে মেনে নিয়েছেন।


১. রাজ্যজয়:

কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের সময় আফগানিস্তান, সিন্ধুর এক বিরাট অংশ, পাঞ্জাব, পার্থিয়া এবং ব্যাকট্রিয়ার কিছু অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। কণিষ্ক এই সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেন। শিলালিপি, মুদ্রা ও বিভিন্ন সাহিত্য থেকে তাঁর রাজ্যজয় সম্পর্কে ধারণা করা যায়। কহুনের ‘রাজতরঙ্গিণী’ ও অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, কাশ্মীর তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। বারাণসীতে তাঁর শিলালিপি পাওয়া গেছে। সৌরাষ্ট্র ও মালবে রাজত্বকারী শকরাজা নহপান তাঁর আনুগত্য মেনে নেন। সাঁচী ও মথুরা তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। হিউয়েন সাঙ-এর রচনা থেকে গান্ধার, পুরুষপুর প্রভৃতি অঞ্চলের ওপর তাঁর আধিপত্যের কথা জানা যায়। চৈনিক ও তিব্বতীয় উপাদান থেকে জানা যায় যে, তিনি পূর্ব-ভারত, অযোধ্যা ও পাটলিপুত্র জয় করেছিলেন। আলবেরুণী আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্থানের ওপর তাঁর আধিপত্যের কথা বলেছেন।


২. রাজ্যসীমা:

ভারতের অভ্যন্তরে উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে সাঁচী এবং পূর্বে বারাণসী থেকে পশ্চিমে সিন্ধুনদ পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। অনেকের মতে তাঁর সাম্রাজ্যের আয়তন আরও বড় ছিল এবং তা পূর্বে বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বলা বাহুল্য, বাংলা ও বিহারে তাঁর মুদ্রা পাওয়া গেলেও, এই স্থান দুটি তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা—এ সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ভারতের বাইরে কাশগড়, খোটান, ইয়ারখন্দ, কাবুল, কান্দাহার, আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান ও ব্যাকট্রিয়া তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। পুরুষপুর তাঁর রাজধানী ছিল।


৩. ধর্মমত:

ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী-র মতে রাজ্যজয় অপেক্ষা বৌদ্ধধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কণিষ্ক স্থায়ী কীর্তির অধিকারী হয়েছেন।* ঐতিহাসিক স্মিথ-এর মতে, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে তিনি ‘দ্বিতীয় অশোকের’ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পুরোনো বৌদ্ধ মঠ, বিহার ও চৈত্যগুলি সংস্কার এবং বহু নতুন মঠ, স্তূপ ও চৈত্য নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ মঠ ও ভিক্ষুদের দানের ব্যাপারেও তিনি মুক্তহস্ত ছিলেন। রাজধানী পুরুষপুর বা পেশোয়ারে বুদ্ধদেবের দেহাবশেষের ওপর তিনি একটি বহুতল-বিশিষ্ট বিশাল চৈত্য ও মঠ নির্মাণ করেন। বৌদ্ধধর্মের পরস্পর-বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মতপার্থক্য

দূর করে বৌদ্ধধর্মকে একটি সুসংহত রূপ দান করার উদ্দেশ্যে বিখ্যাত বৌদ্ধপণ্ডিত বসুবন্ধুর নেতৃত্বে তিনি কাশ্মীরে (মতান্তরে জলন্ধরে) চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি বা মহাসম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে মহাযান ধর্মমতের উদ্ভব ঘটে এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয়। তিনমাসব্যাপী এই অধিবেশনে গৃহীত ও সংকলিত ত্রিপিটকের ব্যাখ্যাসমূহ ‘মহাবিভাষা’ নামে পরিচিত। এটির রচয়িতা হলেন বসুবন্ধু ।


৪. সাহিত্য ও শিল্প:

কণিষ্ক সাহিত্য ও শিল্পের উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মৌর্যযুগে সংস্কৃত ভাষা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু কণিষ্কের আমলে সংস্কৃত ভাষা তার হৃতগৌরব ফিরে পায়। এই যুগে প্রচুর সংস্কৃত গ্রন্থ রচিত হয় এবং বহু যুগন্ধর সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব ঘটে। বিখ্যাত কবি, দার্শনিক, সংগীতজ্ঞ ও পণ্ডিত অশ্বঘোষ, দার্শনিক নাগার্জুন, পণ্ডিত ও শিক্ষাগুরু বসুমিত্র ও পার্শ্ব, রাজনীতিবিদ মাথর, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিদ চরক, স্থপতি এজেসিলাস্ তাঁর রাজসভা অলংকৃত করতেন। সাহিত্য, দর্শন, কবিতা, নাটক, সংগীতচর্চা সব দিকেই তাঁর রাজত্বকাল এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ইতিহাসেও কণিষ্কের রাজত্বকাল এক নবযুগ হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর আমলে নির্মিত মথুরা, তক্ষশিলা, পেশোয়ার প্রভৃতি শহর, অসংখ্য স্তূপ, বিহার ও চৈত্যগুলি তাঁর শিল্প-প্রীতির স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর রাজত্বকালে মথুরা, সারনাথ, অমরাবতী ও গান্ধার— এই চারটি স্থানে চারটি পৃথক শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। তাঁর রাজত্বকালে গ্রীক, রোমান ও ভারতীয় শিল্প-রীতির সমন্বয়ে উদ্ভূত গান্ধার শিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে। তাঁর রাজত্বকালে যে নবজাগরণের সূচনা হয় গুপ্তযুগে তা চরমভাবে বিকশিত হয়।


উপসংহার: 

ভারতে কুষাণ রাজাদের মধ্যে কণিষ্ক ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রণোন্মাদনা ও অশোকের ধর্মীয় উদ্দীপনার এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। তাঁর পূর্বে কোন বিদেশী নরপতি ভারত ও ভারতের বাইরে এত সুবিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হন নি। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক অনৈক্য ও হানাহানির ঐ যুগে আর্যাবর্তের এক বিশাল স্থানে তিনি কেবলমাত্র রাজনৈতিক ঐক্যই স্থাপন করেন নি–সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশের শান্তিও ফিরিয়ে এনেছিলেন। কেবলমাত্র বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতাই নয়, অন্যান্য ধর্মের প্রতিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রতি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তাঁকে “গুপ্ত নবজাগরণের পুরোধা” হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close