ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কার্যাবলী | Firuz Shah Tughlaq

 


ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনকল্যাণমূলক কার্যাবলী | জনহিতকর নীতি | অর্থনৈতিক সংস্কার 


ভূমিকা: 

মহম্মদ-বিন-তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর খুল্লতাত-পুত্র ফিরোজ শাহ ছেচল্লিশ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন (১৩৫১-৮৮ খ্রিঃ)। রণনিপুণ যোদ্ধা, কুশলী রাজনীতিজ্ঞ বা ধর্মনিরপেক্ষ উদার শাসক হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য ছিলেন না। তাঁর মধ্যে ধৈর্যশীলতা ও কষ্টসহিষ্ণুতার যথেষ্ট অভাব ছিল। সমকালীন ঐতিহাসিক বরণী ও আফিফ তাঁর নম্রতা, দয়া, ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও সত্যনিষ্ঠার প্রশংসা করে তাঁকে আদর্শ মুসলিম নরপতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।


কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তন:

ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনকালে শাসনব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

প্রথমত—আলাউদ্দিন খলজী অভিজাতদের সম্পূর্ণভাবে দমন করেছিলেন। মহম্মদ-বিনতুঘলক কেবলমাত্র প্রতিভার ওপর ভিত্তি করে এক নতুন অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। ফিরোজ তুঘলকের সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা ও প্রভাবচ্যুত পূর্ববর্তী অভিজাতরা আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্রের পক্ষে তা ক্ষতিকর হয়। 

দ্বিতীয়ত—আলাউদ্দিন ও মহম্মদ-বিন-তুঘলক রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে উলেমাদের প্রভাব খর্ব করেন, কিন্তু ফিরোজ তুঘলক তাঁদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি মহম্মদ-বিন-তুঘলকের ধর্ম-নিরপেক্ষতার আদর্শ বিসর্জন দিয়ে হিন্দু ও শিয়া মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করতেন। 

তৃতীয়ত—অবলুপ্ত সামন্তপ্রথা তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং জায়গীর প্রথা বংশানুক্রমিক করা হয়।

চতুর্থত—স্থায়ী সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দিয়ে তিনি প্রাদেশিক সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হন। সেনাবাহিনী হয়ে জন্য থেকে তিনি ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথা তুলে দেন। সেনাবাহিনীর নিয়োগও বংশানুক্রমিক পড়ে। 

পঞ্চমত—ক্রীতদাসদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং শাসনকার্যে তাদের হস্তক্ষেপের অধিকার দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যের সংহতি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেন। ষষ্ঠত—প্রজাবর্গের মঙ্গলের তিনি কিছু জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।


জনহিতকর কার্যাবলী:

ফিরোজ তুঘলক তাঁর জনহিতৈষণামূলক কার্যাবলীর জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, সম্ভবতঃ ভারতে তিনিই প্রথম মুসলিম শাসক, যিনি যুদ্ধ ও রাজ্যজয় অপেক্ষা প্রজাবর্গের জাগতিক কল্যাণ সাধনকেই রাজার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলে মনে করতেন। 


পূর্ববর্তী সুলতানের রাজত্বকালের কুশাসন, দুর্ভিক্ষ ও বলপূর্বক কর আদায়ের ফলে জনসাধারণের দুর্দশা চরমে ওঠে। তিনি মহম্মদ-বিন-তুঘলকের আমলের চব্বিশ প্রকার অবৈধ কর বাতিল করেন, ভূমি-রাজস্বের পরিমাণ হ্রাস করেন এবং কোরানে উল্লিখিত কেবলমাত্র চারটি কর ধার্য করা হয়। এই করগুলি হল- (১) ‘খারাজ’ বা ভূমি-কর,b(২) ‘খামস্’ বা যুদ্ধে লুণ্ঠিত দ্রব্যের এক-পঞ্চমাংশ, (৩) ‘জিজিয়া’ বা অমুসলমানদের কাছ থেকে সংগৃহীত ধর্মকর এবং (৪) ‘জাকাৎ’ বা মুসলিমদের কাছ থেকে আদায়ীকৃত ধর্মকর। পরবর্তীকালে উলেমাদের সম্মতি নিয়ে তিনি ‘সেচ-কর’ ধার্য করেন। বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন কর তুলে দিয়ে তিনি বাণিজ্যের প্রসার ঘটান। বিচারব্যবস্থার সংস্কার করে তিনি শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ও দৈহিক নির্যাতন রহিত করেন। কৃষির উন্নতির জন্য তিনি বেশ কয়েকটি সেচ-খাল এবং একশ’ পঞ্চাশটি কূপ খনন করেন। 


বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি একটি কর্ম-নিয়োগ দপ্তর, দরিদ্র মুসলিম কন্যাদের বিবাহ এবং অনাথ ও বিধবাদের ভরণপোষণের জন্য ‘দেওয়ান-ই-খয়রাত’ নামে একটি বিভাগ এবং দরিদ্রদের চিকিৎসার জন্য ‘দার-উল-সাফা' নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। ইসলামীয় শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি বহু বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এছাড়া, তাঁর আমলে বহু মসজিদ, প্রাসাদ, ছত্রিশটি কারখানা, বারশ’টি ফলের বাগান এবং ফিরোজাবাদ, তুঘলকপুর, জৌনপুর, আজাদপুর, ফিরোজপুর প্রভৃতি নতুন নগর নির্মিত হয়। 


ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কার্যাবলীর কথা স্মরণ করে ঐতিহাসিক হেনরী ইলিয়ট ও এল্‌ফিনস্টোন তাঁকে ‘সুলতানী যুগের আকবর’ বলে অভিহিত করেছেন। বলা বাহুল্য, আকবরের চারিত্রিক ঔদার্য, সর্বধর্মের প্রতি সমদর্শী মনোভাব বা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সামান্যতম ভগ্নাংশও ফিরোজের মধ্যে ছিল না। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, তাঁর দীর্ঘ রাজত্বকালে শান্তি ও সমৃদ্ধি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও তাঁর নীতি ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলি যে দিল্লী সুলতানীর পতন ত্বরান্বিত করেছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close