আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি | Economic Reform Policies of Alauddin Khalji


আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক সংস্কার|আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণ|মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি


ভূমিকা:

দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আলাউদ্দিন খলজির শাসনকাল ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তিনি সুলতানি সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। তার অর্থনৈতিক সংস্কারের দুটি দিক ছিল- রাজস্ব সংস্কার এবং বাজারদর বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি। 


রাজস্ব ব্যবস্থা:

অভিজাত সম্প্রদায়কে দুর্বল করা ও রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আলাউদ্দিন রাজস্ব-ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ভারতে তুর্কী শাসকদের মধ্যে আলাউদ্দিনই প্রথম দেশের রাজস্ব-ব্যবস্থা সংস্কারে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি সকল প্রকার জায়গীর, দান, দেবত্র বাজেয়াপ্ত করে। সকল জমিকে ‘খালিসা’ বা সরকারের খাস জমিতে পরিণত করেন। গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের সকল উর্বর জমিকেও তিনি ‘খালিসা’-য় পরিণত করে রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি করেন। মধ্যযুগে এতদিন পর্যন্ত আন্দাজে ভূমিরাজস্ব ধার্য করা হত। অধ্যাপক লাল, ডঃ সতীশ চন্দ্র প্রমুখ ঐতিহাসিকরা বলেন যে, দিল্লীর মুসলিম শাসকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম জমি জরীপ করার রীতি প্রবর্তন করেন। উৎপন্ন শস্যের অর্ধাংশ রাষ্ট্রের কর হিসেবে ধার্য করা হয়। এছাড়া গৃহকর, চারণকর, পশুকর, দুগ্ধবতী গরু, ছাগল প্রভৃতির ওপর কর, হিন্দুদের ওপর ‘জিজিয়া ও মুসলিমদের ওপর ‘খামস্’ ও ‘জাকাৎ’ আরোপিত হয়। ঐতিহাসিক ডঃ ইরফান হাবিব বলেন যে, গ্রামাঞ্চলে খুৎ, চৌধুরী, মোকাদ্দম প্রভৃতি হিন্দু কর্মচারীরা রাজস্ব আদায়ের ভারপ্রাপ্ত ছিল।  

অনেক সময় তারা প্রজাদের শোষণ করত, সরকারী রাজস্ব আত্মসাৎ করত এবং বিনা খাজনায় জমি ভোগ-দখল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। আলাউদ্দিন এইসব ব্যবস্থা রদ করে তাদের আর্থিক অবস্থা খর্ব করেন এবং তাদের দ্বারা বিদ্রোহের সম্ভাবনা নির্মূল করেন। বলা বাহুল্য, তাঁর রাজস্ব ব্যবস্থা সর্বশ্রেণীর মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়। হিন্দুদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। সমকালীন ঐতিহাসিক বারাণী লিখছেন যে, দারিদ্রের চাপে সম্ভ্রান্ত হিন্দু ঘরের মহিলারা মুসলিমদের গৃহে দাসীর কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে বাধ্য হত। কৃষকদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে। তাদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আমীর খসরু লিখেছেন—“রাজমুকুটের প্রতিটি মুক্তা দরিদ্র কৃষকদের অশ্রুপূর্ণ চক্ষু থেকে ক্ষরিত জমাট রক্তবিন্দু মাত্র।” তবে একথা মানতেই হবে যে, জনসাধারণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও, তাঁর এই নতুন নীতির ফলে 

(১) রাষ্ট্রের রাজস্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, 

(২) কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বার হয়ে ওঠে এবং আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থার সূচনা হয়। ডঃ ইরফান হাবিব বলেন যে, আলাউদ্দিনের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।


অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ:

আলাউদ্দিন খলজি অর্থনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংস্কারাবলীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বিশালসংখ্যক সেনাবাহিনীর ব্যয়নির্বাহ ও দিল্লীর নাগরিকদের স্বল্পমূল্যে ভোগ্য পণ্য সরবরাহের জন্য আলাউদ্দিন জিনিসপত্রের দাম বেঁধে দিয়ে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করেন। 


এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, ভারতবর্ষে আলাউদ্দিনই সর্বপ্রথম মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। খাদ্যদ্রব্য ও বস্ত্র থেকে শুরু করে গবাদি পশু, এমনকি দাস-বিক্রয়কে পর্যন্ত তিনি এই নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনেন। কোন ব্যবসায়ী যাতে অধিক মূল্য নিতে না পারে তিনি তার ব্যবস্থা করেন এবং আইন ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। কোন ব্যবসায়ী ওজনে কম দিলে তার সমপরিমাণ মাংস সেই ব্যবসায়ীর দেহ থেকে কেটে নেওয়া হত। যথেষ্ট পরিমাণ শস্য যাতে সর্বদা মজুত থাকে এজন্য তিনি প্রজাদের কাছ থেকে কর হিসেবে অর্থের পরিবর্তে শস্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন এবং তা সরকারী গোলায় রাখার নির্দেশ দেন। সরকার ব্যতীত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফসল মজুত করা নিষিদ্ধ ছিল। এর ফলে দুর্ভিক্ষ হলেও শস্যের দাম বৃদ্ধি পেত না এবং দুর্ভিক্ষের কালে দু'টি ক্রীতদাস-সহ প্রতি পরিবারকে আধ-মণ করে খাদ্যশস্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হত। প্রকৃত পক্ষে ‘রেশনিং ব্যবস্থা’-র প্রবর্তন আলাউদ্দিনের অভিনব কীর্তি। ‘শাহনা-ই-মণ্ডী’ (বাজারের তত্ত্বাবধায়ক) নামক কর্মচারী এসব বিষয় লক্ষ্য রাখতেন। সকল ব্যবসায়ীকে তাঁর কাছে নাম তালিকাভুক্ত করতে হত। এ প্রসঙ্গে ‘দেওয়ানই-রিয়াসৎ’ নামক কর্মচারীর নামও স্মরণযোগ্য।


ফলাফল:

আলাউদ্দিন কর্তৃক বাজার-দর নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা একমত নন। সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরণী এই ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন যে “শস্যের অপরিবর্তিত বাজার সেই যুগের এক বিস্ময় ছিল।” সমকালীন ঐতিহাসিক ফেরিস্তার মতে, এই ব্যবস্থা ছিল অভূতপূর্ব। অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও আলাউদ্দিনের রাজত্বকালের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। আধুনিক ঐতিহাসিক লেনপুল এই ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেছেন যে, এর দ্বারা সাধারণ প্রজাবর্গ উপকৃত হয়। তিনি ধনীদের লুঠ করে দরিদ্রদের উপকার সাধন করেন। তিনি আলাউদ্দিনকে ‘দুঃসাহসী রাজনৈতিক অর্থনীতিক' (“A military genius converted into a daring political economist.') বলে অভিহিত করেছেন। বলা বাহুল্য, ডঃ লাল, ডঃ পি. শরণ প্রভৃতি ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এই ব্যবস্থার ফলে সেনাবাহিনী ও দিল্লীর অবস্থাপন্ন নাগরিকেরাই উপকৃত হয়, কারণ এই ব্যবস্থা দিল্লী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। 


কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারণ অনাবৃষ্টির ফলে উৎপাদন কম হলেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা যেত না। বণিকদের লভ্যাংশ হ্রাস পাওয়ায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা লোপ পায়। ডঃ পি. শরণ বলেন যে “এই নীতি ছিল পুরোপুরি যুক্তিহীন, ভ্রান্ত পরিকল্পনাযুক্ত, কৃত্রিম এবং সকল প্রকার অর্থনৈতিক নিয়ম বহির্ভুক্ত। এর ফলে জনসাধারণের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা, দারিদ্র ও অসম্মান ঘটেছিল।” তবে এই ব্যবস্থা যে সে যুগের পক্ষে অতি অভিনব ছিল, সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। ঐতিহাসিক হাবিব ও নিজামী আলাউদ্দিনের এই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সুলতানী যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক কৃতিত্ব বলে অভিহিত করেছেন।


তথ্য সূত্র:

স্বদেশ পরিচয় | জীবন মুখোপাধ্যায়।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close