সুলতান মামুদের ভারত অভিযানের কারণ


 সুলতান মামুদের ভারত আক্রমণের কারণ উদ্দেশ্য বা প্রেক্ষাপট:


ভূমিকা:

৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আলপ্তগীন নামে জনৈক ভাগ্যান্বেষী আফগানিস্তানে গজনী রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ক্রীতদাস ও জামাতা সুবুক্তিগীন গজনীর সিংহাসনে বসেন। তুর্কী সুলতানদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ভারত আক্রমণের পরিকল্পনা করেন এবং এর ফলে পাঞ্জাবের শাহী বংশের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। শাহীরাজ জয়পালকে পরাজিত করে তিনি সিন্ধুনদের পশ্চিম ভূভাগ পর্যন্ত অঞ্চল দখল করেন। তাঁর পুত্র সুলতান মামুদএর রাজত্বকাল (৯৯৮-১০৩০ খ্রিঃ) ভারতে প্রথম তুর্কী আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। 


সুলতান মামুদ মোট কতবার ভারত আক্রমণ করেন এ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ঐতিহাসিক হেনরী এলিয়ট-এর মতে, ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি মোট সতেরো বার ভারত আক্রমণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্তমানে এই মতটিই মেনে নিয়েছেন। তাঁর ভারত আক্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও ঐতিহাসিকরা একমত নন।


(১) ঐতিহাসিক স্মিথ-এর মতে, “সুলতান মামুদ ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী লুণ্ঠনকারী দস্যু।” ভারতে তিনি নির্বিচারে লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। ধনরত্ন লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেই তিনি এদেশে এসেছিলেন—এখানে কোন স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন নি। 


(২) তাঁর দরবারের ঐতিহাসিক উৎবি মন্তব্য করেন যে “ভারত অভিযানের দ্বারা মামুদ নিজ বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি মহৎ কর্তব্য পালন করেন।” উত্তী-র এই উক্তির উপর নির্ভর করে পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা বলতে শুরু করেন যে, ধর্মীয় উন্মাদনার জন্যই তিনি ভারত অভিযানে আসেন এবং এজন্যই তিনি হিন্দু মঠ-মন্দিরগুলি লুণ্ঠন করতেন। বলা বাহুল্য, এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হিন্দু মঠ-মন্দিরগুলি লুন্ঠন করতেন, কারণ এই যুগে মন্দিরগুলি প্রভূত ধনরত্ন পূর্ণ ছিল। 


হিন্দু মন্দিরগুলি লুণ্ঠন করলেও তিনি হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার কোন চেষ্টা করেন নি—এমনকি তাঁর অধিকৃত সিন্ধু ও পাঞ্জাবে হিন্দুদের ধর্মেও তিনি হস্তক্ষেপ করেন নি। অধ্যাপক জাফর বলেন, তিনি যদি কোন হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে থাকেন তবে তা ধন-রত্নের লোভে। অধ্যাপক হ্যাভেল বলেন যে, তিনি যে-ভাবে কনৌজ বা মথুরা লুণ্ঠন করেছিলেন, প্রয়োজন হলে অনুরূপভাবেই তিনি বাগদাদ বা যে-কোন মুসলিম নগর লুণ্ঠন করতেন। 


(৩) বলা হয় যে, তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল মধ্য এশিয়ার সুবিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা এবং ইরানী সংস্কৃতির নবযুগের পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। এজন্য প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থ ও সম্পদ। এই কারণেই তিনি ভারত অভিযানে অগ্রসর হন। বারংবার ভারত আক্রমণ ও হিন্দু দেব-দেবী মূর্তি ভঙ্গ করার ফলে ইসলাম জগতে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ‘বাৎ-সিকান’ বা ‘মূর্তিভঙ্গকারী’-রূপে খ্যাতি অর্জন করেন। সুতরাং কেবলমাত্র সম্পদ-সংগ্রহই নয়—ইসলাম জগতে নিজ মর্যাদা বৃদ্ধির প্রশ্নটিও তাঁর ভারত আক্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।  


ঐতিহাসিক মহম্মদ হাবিব মন্তব্য করেছেন যে, ভারত আক্রমণে সুলতান মামুদ “সোনা ও সম্মান ব্যতীত অন্য কিছু কামনা করেন নি।” পাঞ্জাবের শাহী-রাজ্য জয় তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। ভারতের প্রধান প্রধান নগর ও মন্দিরগুলিই ছিল তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য এবং এর ফলে তিনি কনৌজ, মথুরা, থানেশ্বর, কালিঞ্জর প্রভৃতি স্থানগুলি লুণ্ঠিত ও বিধ্বস্ত করেন। ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি গুজরাটের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন করেন এবং প্রায় দুই কোটি স্বর্ণমুদ্রা ও প্রচুর অলংকার-সহ গজনীতে প্রত্যাবর্তন করেন। ভারতে কোন স্থায়ী রাজ্য বিস্তার করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।


তথ্য সূত্র:

১. স্বদেশ পরিচয় - জীবন মুখোপাধ্যায়।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close