ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফলাফল বা প্রভাব আলোচনা করো


ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব | ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফলাফল | ধর্মসংস্কার আন্দোলনের তাৎপর্য


ভূমিকা:

ধর্মসংস্কার আন্দোলন ছিল প্রচলিত ধর্মীয় অনুশাসন ও পোপ, যাজক ও বিশপদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন মানুষের প্রতিবাদ। ষোড়শ শতকের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। জার্মানি থেকে ধর্মসংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই দেশগুলিতে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।


ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফলাফল:


১. খ্রিস্টান জগতের বিভাজন: 

ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফলে খ্রিস্টান জগতের ঐক্য ভেঙে পড়ে। পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টীয় জগৎ ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এই দু-ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পোপের একাধিপত্যের অবসান ঘটে। ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্মমত নিয়ে দ্বন্দ্ব বাধে। প্রোটেস্ট্যান্টরা লুথেরান, পিউরিটান, অ্যাংলিকান, প্রেসবিটারিয়ান, হুগেনট্স প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যায়।


২. ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ: 

গির্জা ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছিল। এর ফলে গির্জার ওপর রাষ্ট্রের জয় সূচিত হয়েছিল। প্রোটেস্ট্যান্ট রাজ্যগুলিতে রাজন্যবর্গই গির্জার প্রধান হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের দ্বারাই গির্জার ধর্মীয় মতামত নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ধর্মনীতি ও রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা স্পষ্ট হয় এবং ধর্মীয় প্রধানদের রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়।


৩. নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা: 

পোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার পর উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার উন্মেষ ঘটে। ফলস্বরূপ বিভিন্ন দেশে রাজতন্ত্রের উত্থান ঘটে। ইংল্যান্ড, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পোপ ও গির্জার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে রাজতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করা হয়।


৪. জাতীয় চেতনার প্রসার: 

প্রোটেস্ট্যান্টদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে তার সুফল হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় চেতনার প্রসার ঘটতে শুরু করে। এক দেশ, এক ভাষা, এক ঐতিহ্য, এক সংস্কৃতি—এই আদর্শের উদ্ভব ঘটে। এর পাশাপাশি ইউরোপ জুড়ে পোপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ‘রাষ্ট্রীয় গির্জা’ গড়ে উঠতে শুরু করে। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে গড়ে ওঠা এইসব রাষ্ট্রীয় জাতীয় গির্জাগুলিও জাতীয় চেতনার প্রসারে সাহায্য করে।


৫. ধর্মীয় উদারতা: 

ধর্মসংস্কার আন্দোলন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। সমকালীন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা ধর্মীয়ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগের অধিকার পায়। ধর্মীয়ক্ষেত্রে যাবতীয় অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন হয়ে ধর্মীয় উদারতার সূচনা ঘটে।


৬. প্রতি-ধর্মসংস্কার আন্দোলনের উদ্ভব:

ধর্মসংস্কার আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হিসেবে ক্যাথোলিক ধর্মের মধ্যেও সংস্কার প্রচেষ্টা দেখা দেয়, যা ইতিহাসে প্রতি-ধর্মসংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। প্রোটেস্ট্যান্টদের অগ্রগতি প্রতিরোধ করা এবং রোমের গির্জাগুলির মহিমাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই আন্দোলন শুরু হয়। আসলে ধর্মসংস্কার আন্দোলন লুথারপন্থী, ক্যালভিনপন্থী, জুইংলিপন্থী—এই তিন ভাগে ভাগ হয়ে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে রোমান ক্যাথোলিকরা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে গির্জার ত্রুটি ও দুর্নীতিগুলি দূর করতে সচেষ্ট হন।


মূল্যায়ন:

ধর্মসংস্কার আন্দোলন সাধারণ মানুষের জীবন থেকে গির্জার নিয়ন্ত্রণ ছিন্ন করায় ব্যক্তিস্বাধীনতার বিকাশ ঘটে। ব্যক্তিতান্ত্রিক অধিকারগুলি সম্বন্ধে মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। অন্ধ ধর্মীয় অনুশাসন ছেড়ে যুক্তিবাদী দর্শনের প্রতি তারা ক্রমশ আকৃষ্ট হয়। সপ্তদশ শতকে যে যুক্তিবাদী যুগের সূচনা ঘটে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ধর্মসংস্কার আন্দোলন।


তথ্য সূত্র:

অষ্টম শ্রেণী ইতিহাস শিক্ষক | জে মুখোপাধ্যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close