ইউরোপীয় নবজাগরণের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | European Renaissance


ইউরোপীয় নবজাগরণের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো | European Renaissance


নবজাগরণের সংজ্ঞা: ফরাসি শব্দ ‘রেনেসাঁস’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হল নবজন্ম বা নবজাগরণ। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা ও জ্ঞানের জগতে পরিবর্তন ঘটে, তাকে রেনেসাঁস বা নবজাগরণ বলা হয়।


ইউরোপীয় নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য


১. যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা: 

একাদশ-দ্বাদশ শতক থেকেই ইউরোপের কিছু দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও পণ্ডিত কোনো কিছু গ্রহণ করার আগে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করে নেওয়ার কথা বলেন। ধীরে ধীরে মানুষ যুক্তি ও তথ্যের দ্বারা, বিজ্ঞানের সত্যের আলোকে এবং বিচারবোধের নিরিখে সবকিছু যাচাই করে তবেই গ্রহণ করতে শিখল।


২. প্রাচীন শিক্ষা-সংস্কৃতির পুনরুত্থান: 

পঞ্চদশ শতক থেকে প্রায় অবলুপ্ত প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের মানুষদের স্বাধীন জীবন পদ্ধতি, যুক্তিবাদী মন, প্রাকৃতিক জগতের ধারণা, সৌন্দর্যপ্রিয়তা সম্পর্কে ইউরোপবাসী ধারণা লাভ করে। এর প্রভাবে প্রাচীন শিক্ষা ও সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটতে শুরু করে।


৩. দীর্ঘ বিবর্তনের ফলশ্রুতি:

১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর সেখানকার , মানবধর্মী মনীষীগণ ইটালির মুক্ত পরিবেশে আশ্রয় নেন। এর ফলে গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় সংস্কৃতির সংযোগ ঘটে। ক্রুসেড-এর পর থেকে দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাণিজ্যের প্রসার, নগরের বিকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটতে থাকে।


৪. মানবমুক্তি: 

মধ্যযুগে জন্মসূত্রে মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ ছিল তার অনেকটাই অবসান ঘটেছিল নবজাগরণের যুগে। মধ্যযুগে মানুষ কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে অসহায়ভাবে বেঁচে থাকত। স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, মতামত প্রকাশ করা, যুক্তিতর্ক বা সমালোচনা করার কোনো অধিকারই ছিল না মানুষের। নবজাগরণ মানুষকে এসবের বন্ধন থেকে মুক্ত করে।


৫. ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি: 

মধ্যযুগে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে কিছুই ছিল না। পোপতন্ত্র যেভাবে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করে চলেছিল, নবজাগরণের যুগে ধীরে ধীরে তার অবসান ঘটতে লাগল। মানুষ আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ফিরে পেল।  


৬. অনুসন্ধিৎসা: 

বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ও যুক্তিবাদের কল্যাণে ইউরোপবাসীর মনে অজানাকে জানার আগ্রহ দেখা দেয়। সাহিত্য, দর্শন, শিল্প, বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কে নতুন জ্ঞানলাভের প্রচেষ্টা দেখা দেয়। অপরদিকে, ইউরোপের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের অজানা-অচেনা দেশগুলিতে পৌঁছোনোর বাসনা জেগে ওঠে।


৭. বিজ্ঞানচেতনার উদ্ভব: 

ধীরে ধীরে মানুষের যুক্তিবাদী মন বিজ্ঞানচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ জানার জন্য মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে। মানুষের মনে এতদিনের প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলিকে যুক্তি ও বিভিন্ন তথ্যের দ্বারা যাচাই করে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠে।


মন্তব্য: 

ইতালি থেকে সমগ্র ইউরোপে নবজাগরণ আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। নবজাগরণের হাত ধরে উত্তরণ ঘটে আধুনিক বিশ্বের।


তথ্য সূত্র:

অষ্টম শ্রেণী ইতিহাস শিক্ষক | জে. মুখোপাধ্যায়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close