ভারতের ইতিহাসে নূরজাহানের অবদান আলোচনা করো | নূরজাহান চক্র


ভারতের ইতিহাসে নূরজাহানের ভূমিকা | নূরজাহান চক্র  

ভূমিকা-

‘নূরজাহান' শব্দের অর্থ হল জগতের আলো। পারস্যের মির্জা গিয়াস বেগের কন্যা ছিলেন নূরজাহান ওরফে মেহেরউন্নিসা। ভারতে এসে শেখ মামুদ নামে এক ধর্মপ্রাণ মুসলিমের সাহায্যে গিয়াস বেগ আকবরের দরবারে চাকরি পান। সেখানে আকবর পুত্র সেলিম তথা জাহাঙ্গির মেহেরউন্নিসার অপরূপ সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হন।


নূরজাহানের রাজনৈতিক পরিচয় ও কার্যাবলি- জাহাঙ্গিরের পত্নী নূরজাহানের রাজনৈতিক পরিচয় এবং কার্যাবলি বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত যে বিষয়গুলি উঠে আসে সেগুলি হলো-


১. চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব :

অনুপম রূপলাবণ্যের অধিকারিণী ছিল প্রশংসনীয়। পারসিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চেতনা তাঁর চরিত্রে রুচিবোধ ও আভিজাত্যের সমাবেশ ঘটিয়েছিল। চিত্রশিল্পে তাঁর দক্ষতা ছিল অপূর্ব। তাঁর চরিত্রে মানবিক গুণাবলির বিপুল সমাবেশ ঘটেছিল। তাঁর হৃদয় ছিল কোমল ও দয়াপ্রবণ। দুর্বল ও অসহায়দের কষ্ট নিবারণের কাজে তাঁর আন্তরিকতা ছিল গভীর।


২. রাজনৈতিক দক্ষতা : 

জাহাঙ্গিরের রাজত্বের শেষে মোগল রাজনীতিতে নূরজাহানের প্রায় সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাহাঙ্গির সজ্ঞানে নূরজাহানকে তাঁর প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। সমস্ত সরকারি ফরমানে জাহাঙ্গিরের নামের পাশে নূরজাহান বাদশাবেগম নামটি উল্লিখিত থাকত। এমনকি রাজকীয় স্বর্ণমুদ্রাতেও বাদশা ও বেগম উভয়েরই ছবি খোদিত ছিল। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ এবং বিচক্ষণ। তিনি যে-কোনো জটিল রাজনৈতিক বিষয় সহজেই সমাধান করতে পারতেন।


৩. নূরজাহান চক্র : 

জাহাঙ্গিরের দুর্বলতা ও অসুস্থতার সুযোগে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নূরজাহান একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন যা ‘নূরজাহান চক্র’ নামে পরিচিত। জাহাঙ্গির ক্রমে ক্রমে আমোদ-ও রাজনীতিতে এই চক্রের একাধিপত্য শুরু হয়। নূরজাহানের নেতৃত্বে সদস্যদের মধ্যে ছিলেন তাঁর পিতা মির্জা গিয়াস বেগ, ভাই আসফ খাঁ ও যুবরাজ খুররম।


 ৪. একক স্বৈরাচার : 

1622 খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালে নূরজাহানের কিছু সিদ্ধান্ত তাঁর কর্তৃত্ব করতে থাকে। তিনি কান্দাহার পুনরুদ্ধারের জন্য খুররমকে নির্দেশ দিলে খুররম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। নূরজাহান অতি দক্ষতার সঙ্গে মহাবৎ খাঁ প্রমুখ অভিজাতদের সহায়তায় এই বিদ্রোহ দমন করেন। কিন্তু অচিরেই নূরজাহান মহাবৎ খাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হন এবং তাঁকে সুদূর বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগ করেন।


৫. পতন : 

দিল্লির রাজনীতি থেকে সরে যেতে অনাগ্রহী মহাবৎ খাঁও বিদ্রোহী হন জাহাঙ্গিরকে বন্দি করে সংকট সৃষ্টি করেন। এক্ষেত্রেও নূরজাহান অতি দক্ষতার সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করে জাহাঙ্গিরকে মুক্ত করেন। এই ঘটনার অল্পদিনের মধ্যে জাহাঙ্গির অসুস্থ অবস্থায় মারা যান। জাহাঙ্গিরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নূরজাহানের পতন ঘটে। নতুন সম্রাট শাজাহানের আমলে হারেমের অন্দরে তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত হয়। অবশেষে 1645 খ্রিস্টাব্দে নূরজাহানের মৃত্যু হয়।


৫. কৃতিত্ব : 

ড. ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে, জাহাঙ্গিরের আমলে নূরজাহানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সাম্রাজ্যের পক্ষে শুভ হয়নি। তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে খুররম, মহাবৎ খাঁ প্রমুখ বিদ্রোহী হয়েছিলেন। ড. সৈয়দ নুরুল হাসান ‘নূরজাহান চক্র’ তত্ত্ব মানতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, 1620 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমস্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই জাহাঙ্গিরের ইচ্ছানুসারে হয়েছিল। নূরজাহানের একমাত্র লক্ষ্য ছিল জাহাঙ্গিরের মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং শাজাহানের লক্ষ্য ছিল সিংহাসন দখল করা।


সমালোচনা : 

1627 খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গিরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নূরজাহানের রাজনৈতিক কর্তৃত্বও হ্রাস পায়। মোগল রাজনীতিতে নূরজাহানের কর্তৃত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক লক্ষ করা যায়। ড. ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে নূরজাহান কর্তৃক জাহাঙ্গিরের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখলের ঘটনা মোগল রাজনীতিতে শুভ হয়নি। অন্যদিকে ড. নুরুল হাসানের মতে, 1620 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি ছিল মূলত জাহাঙ্গিরের। 


উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায় যে শাজাহান সিংহাসনে বসার পর নূরজাহানের বাকি জীবন গৃহবন্দি অবস্থায় কাটে। 1645 খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হলে লাহোরে জাহাঙ্গিরের কবরের পাশেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়। ড. ত্রিপাঠী বলেছেন, নূরজাহান জাহাঙ্গিরের জীবনে কোনো অশুভ শক্তি হিসেবে দেখা দেননি, তিনি ছিলেন তার রক্ষাকারী দেবদূতের মতোই।


তথ্য সূত্র-

উচ্চ মাধ্যমিক ইতিহাস সহায়িকা

দাস | পাহাড়ি (Tallent Booster)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close