ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের ভূমিকা | অবদান

 


ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের ভূমিকা / অবদান | ধর্মসংস্কার আন্দোলন | জার্মানির ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথার


সূচনা : 

ইউরোপে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন মার্টিন লুথার। উত্তর জার্মানির থুরিন্ধিয়া প্রদেশের ইসিলবেন গ্রামে এক কৃষক পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন (১৪৮৩ খ্রি.)। তিনি গির্জা ও যাজকদের অনাচার ও দুর্নীতির অবসান ঘটানোর জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন।


ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের ভূমিকা 


১. বাইবেল অনুবাদে অনুপ্রেরণা : 

উইলিয়াম ওকামের চিন্তাধারার দ্বারা লুথারের ধর্মীয় ভাবনা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। সাধু অগাস্টিনের বাণী “বিশ্বাসে ভগবানের আর্শীবাদ মেলে”—লুথারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জ্ঞান ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য শাস্ত্র পড়ার লক্ষ্যেই নিজ নিজ ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ প্রয়োজন —লুথার এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে বাইবেলের অনুবাদে উৎসাহ জোগান। তিনি জার্মান ভাষায় ল্যাটিন বাইবেলের অনুবাদ করেন।


২. ধর্মীয় অনাচারের প্রতিবাদ :

প্রচলিত খ্রিস্টধর্মের শোচনীয় অবস্থা দেখে লুথার গভীরভাবে ব্যথিত হন। খ্রিস্টধর্মের এবং গির্জার বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সরব হন। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয় ভেবে তিনি রোমে গিয়ে (১৫১০ খ্রি.) পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং যাবতীয় ধর্মীয় অনাচার ও দুর্নীতি দূর করার জন্য পোপকে অনুরোধ জানান। কিন্তু পোপ তাঁর আবেদনে সাড়া দেননি।


৩. মার্জনাপত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ : 

১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে যাজক টেটজেল রোমের ‘সেন্ট পিটার্স গির্জা’ সংস্কারের নামে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি উত্তর জার্মানির স্যাক্সনিতে ইন্ডালজেন্স বা মার্জনাপত্র নামে পাপমুক্তির ছাড়পত্র বিক্রি করতে শুরু করেন। লুথার এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি সে সময়ের রীতি মেনে উইটেনবার্গ গির্জার দরজায় ৯৫ দফা অভিযোগ সংবলিত এক প্রতিবাদপত্র টাঙিয়ে দেন। লুথার প্রচার করেন—“মানুষ তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে অনুতাপের মাধ্যমে, পোপের কাছ থেকে মার্জনাপত্র কিনে পাপমোচন করা যায় না।"


৪. প্রতিবাদী খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠা : 

সে সময়কার অনাচার ও ভ্রষ্টাচারে ডুবে থাকা ক্যাথোলিক ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে লুথার তাঁর মতবাদ প্রচার করেন। তাই তাঁর মতবাদ ‘প্রতিবাদী খ্রিস্টধর্ম’ বা ‘প্রোটেস্ট্যান্টবাদ’ নামে পরিচিত। তিনি ‘ব্যাবিলনীয় দাসত্ব’ ও ‘জার্মানজাতির খ্রিস্টান অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন’ নামে দুটি গ্রন্থে পোপের প্রাধান্য, যাজকদের ঈশ্বর কর্তৃক নিযুক্তি এবং ধর্মাধিষ্ঠানে যাজকদের প্রাধান্য অস্বীকার করেন।


৫. পোপের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ : 

লুথার পোপ ও গির্জার প্রতি তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেন। বাইবেলের ব্যাখ্যাকার পোপের চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে লুথার চ্যালেঞ্জ জানান। এ ছাড়া তিনি পোপ কর্তৃক ধর্মীয়.কর সংগ্রহেরও বিরোধিতা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পোপ দশম লিও লুথারকে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দেন। লুথারকে ধর্মাধিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করে পোপ তাঁর কাছে এক আদেশনামাও পাঠান। কিন্তু লুথার পোপের সেই আদেশনামা জনসমক্ষে পুড়িয়ে দেন।


৬. ওয়ার্মসের সভায় মতপ্রকাশ : 

পোপের ইচ্ছানুসারে জার্মান সম্রাট পঞ্চম চার্লস জার্মানির ওয়ার্মস শহরে এক ধর্মীয় আলোচনাসভার আয়োজন করেন (১৫২১ খ্রি., ২১ এপ্রিল)। এই সভা ওয়ার্মসের সভা নামে পরিচিত। এই ধর্মসভায় সম্রাট, জার্মানবাসী ও পোপের প্রতিনিধির সামনে লুথার নিজের মতকে অভ্রান্ত বলে ঘোষণা করেন। এই ধর্মসভায় লুথারের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে পোপ লুথারকে পুড়িয়ে মারার ও তাঁর রচিত সব পুস্তক পুড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু জার্মান সামন্ত রাজা ফ্রেডারিক লুথারকে আশ্রয় দিলে পোপের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।


মূল্যায়ন : 

বহু চেষ্টা সত্ত্বেও লুথারকে হত্যা করা বা তাঁর মতাদর্শকে মুছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ লুথারের মতবাদকে সাধারণ জার্মানবাসী থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শাসকগণ পর্যন্ত সকলেই সমর্থন করেছিলেন। লুথার পোপের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলে খ্রিস্টীয় জগৎ ক্যাথোলিক (পোপের সমর্থক) এবং প্রোটেস্ট্যান্ট (লুথারের সমর্থক) এই দু-ভাগে ভাগ হয়ে যায়।


তথ্য সূত্র- ইতিহাস শিক্ষক (জে মুখোপাধ্যায়)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close