ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল | ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের পটভূমি


ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ | ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট | ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের গুরুত্ব | ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের প্রভাব


ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের কারণ:

মধ্য সপ্তদশ শতকের ইংলন্ডের গৃহযুদ্ধকে ক্লারেনন্ডন ‘মহাবিদ্রোহ’ (great rebellion) বলে উল্লেখ করেছেন। বিক্ষুব্ধ অভিজাতরা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। এস. আর. গার্ডিনার একে বলেছেন পিউরিটান বিপ্লব। ক্রিস্টোফার হিল মনে করেন ইংল্যান্ডে এক বুর্জোয়া বিপ্লব ঘটেছিল, প্রগতিশীল শক্তিগুলি মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াস চালিয়েছিল।  


১৬৪২খ্রি. জুন মাসে পার্লামেন্ট রাজা প্রথম চার্লসের কাছে উনিশ দফা দাবি পত্র পেশ করেছিল (Nineteen Propositions)। পার্লামেন্ট সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদে নিয়োগের দাবি করেছিল, দাবি করেছিল চার্চের সংস্কার এবং ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের প্রতি ইংল্যান্ডের সমর্থন। রাজা পার্লামেন্টের এসব দাবি বাতিল করলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। গার্ডিনার মনে করেন এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আদর্শের লড়াই। একদিকে রাজতন্ত্র তার ‘বিশেষ অধিকারসমূহ’ (Prerogative) রক্ষা করতে চেয়েছিল, অন্যদিকে বিরোধীরা ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সরকার গঠনের কথা তুলেছিল। 


গার্ডিনারের এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা হয়েছে তবে কেউ একে পুরোপুরি নস্যাৎ করেননি। যারা অ্যাংলিক্যান চার্চের পক্ষে ছিলেন তারা রাজার সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেন, অপর দিকে বিপ্লবী সৈন্যবাহিনীর বেশিরভাগ ছিল পিউরিটান। রাজার সমর্থকরা সকলে যে তার রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সহমত ছিলেন তা নয়।


মার্কসবাদের আলোকে আলোকিত বিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিকরা ধর্মীয় কারণকে শুধু গৃহযুদ্ধের কারণ হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ। এই ব্যাখ্যায় বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার পরিচয় নেই, ভূস্বামীরা এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও যথার্থভাবে পাওয়া যায় না। মার্কসবাদীরা জানাচ্ছেন যে উদীয়মান পুঁজিবাদী জেন্ট্রি শ্রেণী সামস্ততান্ত্রিক অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল; বলপ্রয়োগে এদের ক্ষমতাচ্যুত করা ছিল এদের লক্ষ্য।

কৃষিনির্ভর সামন্ততান্ত্রিক অবস্থান থেকে তারা ইংলন্ডকে পুঁজিবাদী শিল্প-বাণিজ্য নির্ভর দেশে পরিণত করতে চেয়েছিল। অধ্যাপক আর. এইচ. টনির (Tawney) জেন্ট্রি শ্রেণীর ওপর গবেষণা এই তত্ত্ব খানিকটা প্রমাণ করেছে। জেন্ট্রি শ্রেণী ষোড়শ শতক থেকে সম্পদ ও প্রভাব বাড়িয়ে চলেছিল; এদের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের শিল্প-বাণিজ্য সমৃদ্ধ পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল পার্লামেন্টের পক্ষ নিয়েছিল, কৃষি নির্ভর অনগ্রসর উত্তর ও পশ্চিম রাজার পক্ষ ছিল।


এই মার্কসবাদী ব্যাখ্যার একটি প্রধান দুর্বলতা হল জেন্ট্রি শ্রেণী পুঁজিবাদী ছিল না, অভিজাতরা সামন্ততান্ত্রিক ছিল বলা যায় না। ইংল্যান্ডে পুঁজিপতিরা ছিল, তারা হল শহুরে বণিক, বিপ্লবে তাদের প্রধান ভূমিকা ছিল না, বিপ্লবের প্রথম পর্বে তারা রাজাকে সমর্থন করেছিল। 


ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের ফলাফল / গুরুত্ব 

গৃহযুদ্ধের এমন ব্যাখ্যা নেই যা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য; সে সময়কার মানুষের চিন্তাভাবনা, আনুগত্য, বিশ্বাস, ইত্যাদির সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাখ্যা নেই। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই কারণ মানুষের মনস্তত্ব হল অত্যন্ত জটিল, মানুষ পুতুল নয় যে জাদুকর দড়ি ধরে তাকে নাচাবে। বলা হয়েছে যে পিম রাজতন্ত্রের বিশেষ অধিকারের বিরোধিতা করে এবং স্পেন বিরোধী নীতির মাধ্যমে তার প্রভিডেন্স আইল্যান্ড কোম্পানিতে (Providence Island Company) বিনিয়োগকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। হয়তো এর মধ্যে সত্য আছে, এর সঙ্গে এটাও আছে পিম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আদর্শবাদের প্রতি অনুগত ছিলেন।  


হাইড (Hyde) রাজার পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন কারণ তিনি মনে করেন আইনের শাসন, সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি রক্ষিত হবে, এটা ছিল তার স্থির বিশ্বাস, এতে ঘাটতি ছিল না। পরাস্ত হয়ে তিনি জমিদারি ছেড়ে নির্বাসনে চলে যান, বিপ্লবীদের সঙ্গে আপস করেননি। রাজনৈতিক জাতি (Political nation) নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে এগিয়েছিল, ব্যক্তিগত ও পরিবারিক কারণকে অগ্রাহ্য করা যায়নি। ব্যক্তিগত আনুগত্যের জন্য স্যার এডমন্ড ভারনি (Verney) রাজার পক্ষে যোগ দেন যদিও তিনি রক্তপাত পছন্দ করেননি, এমনকী তিনি চেয়েছিলেন রাজা প্রথম চার্লস বিরোধীদের দাবি মেনে নিয়ে আপস করুন। 


আনুগত্যের মতো রাজ-বিরোধিতাও ছিল সমান শক্তিশালী। ১৬৪২ খ্রি. পার্লামেন্ট ও রাজতন্ত্রীরা প্রায় একই জিনিস চেয়েছিল, বিরোধ ছিল মাধ্যম নিয়ে (means)। কীভাবে সাংবিধানিক সরকার স্থাপিত হবে এবং বজায় রাখা হবে তা নিয়ে মতৈক্য ছিল না। চার্লস ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি সিংহাসনে থাকলে যুদ্ধ ছাড়াই বিরোধ মিটে যেত। গৃহযুদ্ধের গভীর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন ঐতিহাসিকরা, মনে রাখা দরকার যে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ হল ব্যক্তিত্বের সংঘাত। এটা হল বাস্তব অবস্থা।


তথ্য সূত্র:

আধুনিক ইউরোপ আদি পর্বের রূপান্তর (১৪০০-১৭৮৯) - সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়।

(আলোচ্য প্রশ্নের উত্তরটি উপরিউক্ত বই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই বইয়ের প্রকাশক এবং লেখকের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ)।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
close